শিরোনাম

প্রচ্ছদ খোলা কলাম, শিরোনাম, স্লাইডার

মোহাম্মদ হাফিজ (বীর প্রতীক)

অপারেশন গোয়াইনঘাট

জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন | বুধবার, ৩০ জানুয়ারি ২০১৯ | পড়া হয়েছে 874 বার

অপারেশন গোয়াইনঘাট

‘………….. দুপুর ১২টার দিকে শত্রুরা আমাদের তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এ সময় অসংখ্য পাকিস্তানী সেনা আচমকা পেছন দিক থেকে এসে ‘হেন্ডসআপ’ বলে চিৎকার করে ওঠে। আমি বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে তাৎক্ষনিক শত্রুর দিকে এলোপাথারি ব্রাশফায়ার করি। আমার সংগে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী সেনাদের ত্রিমুখী আক্রমন খুবই সাহসের সাথে মোকাবিলা করেন। আমরা সবাই শত্রুর বেষ্টনী থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়। সেদিনের ঘটনাটি ছিল আমার মু্ক্তিযুদ্ধ জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা…..।’

উপরোক্ত কথাগুলো মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হাফিজ তাঁর এক লেখায় স্মৃতিচারন করেন, ৭১ সালের গোয়াইনঘাট যুদ্ধ নিয়ে।


যে কটি যুদ্ধ বাংলাদেশের দ্রুত বিজয়ের পটভূমি তৈরি করে তার মধ্যে গোয়াইনঘাট যুদ্ধ অন্যতম।
গোয়াইনঘাট সিলেট জেলার অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭১ সালে সেখানে ছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর শক্ত এক ঘাঁটি। খতরনাক আজাদ কাশ্মীর ও পান্জাব টুসি ব্যাটালিয়ানের সমন্বয়ে গড়া শত্রুবাহিনী, আর সাথে ছিল বিপুল সংখ্যক রাজাকার।

মোহাম্মদ হাফিজ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে নায়েব সুবেদার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। পৈত্রিক বাড়ি ব্রাহ্মনবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার #রতনপুর গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধ করেন জেড ফোর্সের অধীনে।

কার্তিক মাস। কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাত। ঘুটঘুটে অন্ধকার। এরই মধ্যে মোহাম্মদ হাফিজ তার প্লাটুন নিয়ে নি:শব্দে এগিয়ে যেতে থাকলেন গোয়াইনঘাটের দিকে। ব্রিজহেড তৈরির মাধ্যমে অতিক্রম করেন সুরমা নদী। মধ্যরাতে নানা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে অবস্থান নেন শত্রুর কাছাকাছি।
ঘড়ির কাটা অনুসারে ২৪শে অক্টোবর । সময় গড়াতে লাগল, রাত ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই পরিখা খনন করে প্রতিরক্ষা অবস্থান তৈরিতে ব্যাস্ত। ভোর আনুমানিক সাড়ে পাঁচটার দিকে উল্টো পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তিনদিক থেকে মুক্তিবীহিনীর ওপর একযোগে আকস্মিক হামলা করে। মুক্তিযোদ্ধারা প্রথমে কিছুটা বিপর্যস্থ হয়ে পড়লেও মোহাম্মদ হাফিজের প্রচেষ্ঠায় দ্রুত সংঘঠিত হয়ে পাল্টা আক্রমন চালান। তাদের সাহসিকতায় সাময়িক ভাবে থেমে গেল পাকিস্তানীদের অগ্রযাত্রা।

দিনভর চলে রক্তাক্ত মরনযুদ্ধ। কেউ এক ইঞ্চি পিছু হটছে না। সমানে সমানে যুজে যাচ্ছে একে অপরকে। একদিকে দূর্ধর্ষ পান্জাব ব্যাটালিয়ান অন্যদিকে শ্যামল বাংলার ছেলেরা। একদিকে ট্রেইনড পাকবাহিনী ছুড়ছে কামানের গোলা ও রকেট শেল, অন্যদিকে মুক্তিবাহিনী এলএমজি আর থ্রী নট থ্রী দিয়ে তার জবাব দিচ্ছে।

দুপুরের দিকে হেলিকপ্টারযোগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক নতুন দল এসে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে। পাকিস্তানী সেনাদের ফায়ার পাওয়ার এত বেশী ছিল যে মুক্তিযোদ্ধারা মাথায় তুলতে পারছিল না। উপরোন্ত মোহাম্মদ হাফিজ ও তার সহযোদ্ধারা পাকিস্তানী সেনাদের ত্রিমুখী ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যায়। সে সময় নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তাঁরা শত্রুবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধ করেন। পুরো গোয়াইনঘাট এলাকা রক্তক্ষয়ী রনক্ষেত্রে পরিনত হয়। কোনো কোনো জায়গায় দু’পক্ষের হাতাহাতি যুদ্ধ পর্যন্ত হয়। দেখতে দেখতে জায়গাটা ভরে যায় লাশের পর লাশে। এ যুদ্ধে প্রমানিত হয়, বাঙালীরা এখন সম্মুখযুদ্ধেও পারদর্শী। আর এক বিন্দুও ছাড় নয়, তাঁরা এখন নেক টু নেক যুদ্ধ করবে। মোহাম্মদ হাফিজ গোয়াইনঘাটের যুদ্ধে অসাধারন বীরত্ব দেখান।

মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও শৌর্যের জন্যে বাংলাদেশ সরকার মেহাম্মদ হাফিজকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করে। বীরত্বভূষন নং ৫২। নবীনগরের এই সূর্যসন্তান ২০০৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন।
তাঁর প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী।

গ্রন্থনা : জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন।

তথ্য ঋণ:
>> বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্র।
>> একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা- দ্বিতীয় খন্ড, প্রথমা প্রকাশনী।
>> খেতাবপ্রাপ্ত সম্মাননা স্মারকগ্রন্থ, জনতা ব্যাংক।
>> মুক্তিযোদ্ধা মন্জুর আহমেদ, বীর প্রতীক ।
>> উইকিপিডিয়া।

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 4631 বার

নবীনগরের এপ্রিল ট্রাজেডি ১৯৭১

২৯ এপ্রিল ২০১৭ | 2665 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১