শিরোনাম

প্রচ্ছদ আলোকিত জন, জাতীয়, জেলা সংবাদ, নবীনগরের খবর, শিরোনাম

আজ শহীদ আবদুল মান্নান বীর বিক্রম এঁর ৪৯তম মৃত্যু বার্ষিকী

জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন | বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২০ | পড়া হয়েছে 290 বার

আজ শহীদ আবদুল মান্নান বীর বিক্রম এঁর ৪৯তম মৃত্যু বার্ষিকী

সমস্ত শরীরে দারুন এক আবেগ খেলে গেল। এ এক অন্যরকম অনূভুতি। তা লিখে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই। আহ! শেষ পর্যন্ত কবরটি খুঁজে পেলাম।‘ দীর্ঘ ৪৮ বছর পর, ২০০ মাইল দুরে এক শহীদের পাশে এক আপনজন। আপনজনই তো, একই এলাকার মানুষ।

ঘটনাটি এরকম……….,
এক মুক্তিযোদ্ধার কবরের খুঁজে রওনা দেয়। নবীনগর থেকে চট্টগ্রামের মদুনাঘাট, হালদা নদীর পাড়ে। দীর্ঘদিনের লালিত ইচ্ছা পূরনের আকাংখা নিয়ে। সূনির্দিস্ট ঠিকানা কিছুই জানিনা, ভরসা শুধু বুকপকেটে থাকা নোটবুক ও কিছু বইয়ের কাটিং।


একটু পিছনে ফিরে তাকাই; নবীনগর উপজেলার খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গবেষণার সময় সর্বপ্রথম জানলাম যে, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বীর বিক্রম মারা যান চট্টগ্রাম মদুনাঘাট যুদ্ধে। এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। যোগাযোগ করলাম শহীদের এক ভাতিজার সাথে, শামসুল হুদা – নবীরগর কলেজ পাড়া। তিনি জানালেন যে, মদুনাঘাটের পার্শ্ববর্তী বড়ুয়াপাড়ায় রয়েছে তার চাচার কবর । ব্যস সেদিনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, কোন একদিন খুঁজে নেব শহীদ আবদুল মান্নান এঁর কবর।

দিনটি ছিল ২৫ শে জুন, ২০১৯। মঙ্গলবার। দুপুরের পর চট্টগ্রাম শহর থেকে ট্যাক্সি নিয়ে রওনা দেয়। স্থানীয় একজন ড্রাইভারকে বেছে নিলাম। যে চট্টগ্রামের ভাষা জানে, যা পরবর্তীতে পুরো সফরেই আমার অনেক কাজে আসে। গন্তব্য মদুনাঘাট। গাড়ী ছুটে চলছে শহর ছেড়ে হালদা নদী আর কাপ্তাই অভিমুখে।

শহীদ আবদুল মান্নান, যাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস। চেপে রাখা আবেগ যেন আর বাঁধ মানছে না।‘ প্রায় ঘন্টা দুয়েক চলার পর মোবাইলের গুগল ম্যাপ দেখে গাড়ী থেকে নামলাম, মদুনাঘাট বিদ্যুৎ-ষ্টেশনের পাশে। যা ধ্বংস করতে যেয়েই জীবন দিলেন শহীদ আবদুল মান্নান। ঘুরে দেখলাম, কিছু ছবি তুলে নিলাম। স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে বড়ুয়াপাড়া যাওয়ার রাস্তা সম্পর্কে আইডিয়া নিলাম। এরই মধ্যে বিকাল গড়াচ্ছে। আমাদের দ্রুতই কাজ শেষ করতে হবে।

এ সেই মদুনাঘাট বিদ্যুৎ স্ট্যাশন যেটি ধ্বংস করতে গিয়েই প্রাণ হারান আব্দুল মান্নান

মদুনাঘাট ব্রীজ পার হয়ে হাতের বামপাশ দিয়ে একটি সরু রাস্তায় ঢুকলাম। নদীর পাশ দিয়ে যাচ্ছি, নদীতে টলটলে স্বচ্ছ পানি, কিছুটা স্রোতও আছে। কিন্তু বিধি বাম, সামনে রাস্তা কাটা। মেরামতের কাজ চলছে গাড়ী নিয়ে আর যাওয়া যাবেনা। হয় রিক্সা, নয় অটোতে যেতে হবে, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। ড্রাইভারকে বললাম পুনরায় মেইন রোডে ওঠতে। এরই মধ্যে বিকাল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না, এতদুর এসে ব্যর্থ হয়ে ফেরত যাব!

সিদ্ধান্ত নিলাম মাগরিবের আযান পর্যন্ত খুঁজব। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক ধরে আরেকটু সামনে এসে হাতের বামপাশে দিয়ে আরেকটি রাস্তায় ঢুকলাম। যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। মাঝে মধ্যে ড্রাইভার একে-ওকে জিঙ্গেস করছে। আর আমি মনে মনে আল্লাহ ডাকছি আর ভাবছি, ‘একটি সৎকাজে এসেছি নিশ্চয় বিফল হবো না।’ রাউজান থানার অন্তর্গত উরকিচর এলাকাটি গহীন জঙ্গল না হলেও অনেকটা জঙ্গলপূর্ণ। কয়েক কিলোমিটার যাওয়ার পর একজন পথচারী বলল, ‘বড়ুয়াপাড়ায় যেতে হলে সামনেই পড়বে আবুরখিল স্কুল তার পাশ ঘেঁষেই ছোট রাস্তা।‘ কিছুটা ভরসা পেলাম। অল্প একটু সামনে যেতেই স্কুলটি দেখতে পেলাম। যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা ‘মদুনাঘাট অপারেশনে’র সময় গোপন আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেন। তার পাশেই চল্লিশোর্ধ একটি লোক জংলী দা দিয়ে জঙ্গল কাটছিল। তাকে জিঙ্গেস করতেই তিনি বললেন চেনেন, ‘তবে গাড়ী আর যাবেনা হেঁটে যেতে হবে। স্থানীয় লোকটির নাম রন্জীত বড়ুয়া। ড্রাইভার তার গাড়ী এই নির্জন স্থানে খালি ফেলে যেতে রাজী নয়। অগত্যা আমি একাই ছুটলাম, ছুটলাম বলতে দৌড় লাগালাম।
এলাকাটি প্রচুর গাছপালায় আচ্ছাদিত, তার ভিতর দিয়ে ইট বসানো হাঁটার পথ ধরে এগুচ্ছি। আশেপাশে কোন জনমানুষের চিহ্ন নেই। কিছুটা ভয়ও লাগছে। কিছুদুর এগিয়ে রন্জীত বড়ুয়া হাত দিয়ে দূরে একটি ঘন জঙ্গল দেখালেন, একটু নিচু সমতল ভুমির মাঝে গাছ গাছালি ঘেরা জায়গাটি। উঁচু রাস্তা থেকে নেমে কাদামাটি মাড়িয়ে হাঁটছি। যতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম ততই প্রচন্ড আবেগে শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিল। কিছু পতিত জমি পেরিয়ে যখন পৌঁছলাম। ঝোপঝাড়, লতা-গুল্মের আগাছায় ঘেরা একটি কবর। ধূলো ময়লায় ঢেকে থাকা লিখাটি রন্জীত বড়ুয়া হাত দিয়ে মুছতেই বেড়িয়ে এল খোদাই করে লিখা “শহীদ আবদুল মান্নানের নাম”। নির্বাক চোখে আমি শুধু তাকিয়ে আছি। আবেগতাড়িত। যে মান্নানের পথচেয়ে মা বসেছিল, ছেলে যুদ্ধশেষে বাড়ি ফিরবে, সে আদূরের মান্নান শতমাইল দূরে এখানে চিরতরে ঘুমিয়ে আছে। আবেগ ধমিয়ে রাখলেও চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। হয়তোবা চোখও কিছুটা হালকা হতে চাই। কিছুটা হতাশ, বুঝাই যাচ্ছে এই কবরে কারো খুব বেশী একটা আসা হয়না। তবুও ধন্যবাদ স্থানীয় বড়ুয়াপাড়ার আবুরখীল জনকল্যাণ সমিতিকে, অন্তত শহীদের স্মৃতিচিহ্নটুকু ধরে রেখেছেন। পুরো এলাকাটিই জঙ্গল ঘেরা, সবুজের মাঝে একটু কালচে ভাব। অদ্ভুত সুন্দর একটা জংলা গন্ধ নাকে লাগছে। এই ঘ্রানটা অচেনা কোনস্থান থেকে এসে পুরো কবরজুড়ে ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে আগলে রেখেছেন, অনেক ভালবাসায়।

সূরা ফাতিমা, সূরা এখলাস ও দুরুদ পাঠের মাধ্যমে শহীদের কবর জিয়ারত করলাম। অল্প সময় কাটালাম, উপায়ও নেই। বড়ুয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে ধীর পায়ে একটু একটু করে কবর থেকে সরে আসতে লাগলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে শেষবারের মত দেখলাম। আর মনে মনে বললাম আপাতত বিদায় হে নবীনগরের সূর্যসন্তান। হে মৃত্যুঞ্জয়ী বীর, আপনাকে স্যালুট। আপনার প্রতি হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা।

গাড়ী ছুটছে চট্টগ্রাম শহরের দিকে, অন্ধকারে হালদা নদীর পাড়ে বসতভিটায় আলো জ্বলছে । দুর থেকে টিমটিম করে। দেখছি আর মনে মনে অনেক শোনা একটি গানের কথা মনে পড়ছে………

“হয়তো বা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবেনা।‘
বড় বড় লোকেদের ভীড়ে, জ্ঞানী আর গুণীদের আসরে, তোমাদের কথা কেউ কবেনা।
তবু হে বিজয়ী বীর মুক্তিসেনা,
তোমাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবেনা।।”

আজ ৭ই অক্টোবর, শহীদ আবদুল মান্নান বীর বিক্রম এঁর ৪৯তম মৃত্যু বার্ষিকী। তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

( লিখাটি “নবীনগরের সর্য সন্তান বই থেকে নেওয়া)।

তথ্য ও কৃতজ্ঞতাঃ
শামসুল হুদা, রন্জীত বড়ুয়া, ড্রাইভার জামাল।

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ড.আকবর আলী খান

১২ মে ২০১৬ | 6940 বার

আমরা তোমাদের ভুলবনা

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 6325 বার

তুষার আব্দুল্লাহ

২৬ এপ্রিল ২০১৬ | 2994 বার

‘শেষ ব্যক্তি শেষ বুলেট’

২৯ নভেম্বর ২০১৮ | 1889 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১