শিরোনাম

প্রচ্ছদ সাহিত্য পাতা, স্লাইডার

এই বৈশাখে চাই মুক্তিবৃক্ষের আশীর্বাণী

আলী যাকের | বৃহস্পতিবার, ১২ মে ২০১৬ | পড়া হয়েছে 1876 বার

এই বৈশাখে চাই মুক্তিবৃক্ষের আশীর্বাণী

বৈশাখে দাবদাহে ওষ্ঠাগত প্রাণ। রৌদ্র চড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিদাঘের প্রচণ্ডতায় আঁইঢাঁই প্রাণ। শুষ্ক চারিদিক। এ সময় ঘরে কিংবা বাইরে যদি তাপানুকূল পরিবেশ না থাকে, তাহলে গ্রীষ্মের দাপট বেশ ভালো বোঝা যায়। একমাত্র বৃক্ষের ছায়ায় কিছুটা শান্তি মেলে বুঝি। শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য গ্রীষ্ম মোটেই কারো প্রিয় ঋতু হতে পারে না। কিন্তু তবুও কী যেন আছে এই ঋতুটির মাঝে, যা আমাকে উদাস করে দেয়। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ে যায়—‘মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি/হে রাখাল, বেণু তব বাজাও একাকী… জাগায় বিদ্যুৎ ছন্দে আসন্ন বৈশাখী/হে রাখাল বেণু যবে বাজাও একাকী।’ আমি একবার আমাদের দেশের প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বছরের কখন শান্তিনিকেতনে যাওয়ার প্রকৃষ্ট সময়। জবাবে বন্যা বলেছিল, ‘শুনলে বিশ্বাস করবেন না হয়তো, রবীন্দ্রনাথ বোলপুরে গ্রীষ্মকালকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। এবং তাঁর অনেক কবিতা, গান ভরা গ্রীষ্মে রচিত।’ এই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য একবার ভরা গ্রীষ্মে আমি শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম। বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুরে গ্রীষ্মকালে সত্যিই প্রচণ্ড দাবদাহ বয়ে যায়। শান্তিনিকেতনে বেশির ভাগ মানুষ সাইকেলে চলাচল করে। ওই সময় দেখেছি যে তাপ প্রতিহত করার জন্য তারা মুখের ওপর কাপড় জড়িয়ে নেয়। সূর্যের উত্তাপ এতটাই হয় তখন,  শরীরের চামড়া পুড়ে যায়। কিন্তু অবাক কাণ্ড, শান্তিনিকেতনে যে বিশাল বৃক্ষরাজি তার নিচে গেলে গ্রীষ্মকে আর তত অত্যাচারী বলে মনে হয় না। আমি ওই গ্রীষ্মে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সর্বত্র গাছের ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে বেড়িয়েছি। আর মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কথা। যেন দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছি শ্মশ্রুমণ্ডিত রবীন্দ্রনাথ, পেছনে দুই হাত, গাছের ছায়ায় ছায়ায় তাঁর সৃষ্টি শান্তিনিকেতনের সর্বত্র মৃদুমন্দ গতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

আমাদের বাংলাদেশে ছয়টি ঋতুরই আগমন এবং প্রস্থান মোটামুটি বোঝা যায়। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে গ্রীষ্মের কথাটি মনে পড়ে সবচেয়ে বেশি। আমার বাল্যকাল কেটেছে বাংলাদেশের ছোট ছোট শহরে, বাবার চাকরিসূত্রে। ওই সব জায়গায় পাকা বাড়িঘর তখন ছিল অতি নগণ্য সংখ্যায়। বেশির ভাগ জায়গাজুড়ে থাকত বিশাল বৃক্ষরাজির বন। আম, কাঁঠাল, জারুল, সেগুন, মেহগনি, কড়ই আরো কত বিচিত্র বৃক্ষ। স্কুল না থাকলে এসব বৃক্ষের নিচেই আমাদের সময় কাটত বেশির ভাগ। লুকোচুরি, ডাণ্ডা-গুলি, গোল্লাছুট ইত্যাদি খেলা নিয়ে মাতামাতি। কী সব দিন গেছে শৈশবে! মাঝেমধ্যে বাড়ির কাছের পুকুরে কিংবা অল্প দূরের নদীতে সুশীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্তিতে ভরে গেছে দেহ-মন। আরেকটু বড় হওয়ার পর, আমরা তখন ঢাকায় এসে থিতু হয়েছি, গ্রীষ্মে ওই একইভাবে গাছের ছায়ায় ছায়ায় কেটেছে দিন। চৈত্রদিনের শেষে কোকিলের আহাজারি মনকে সিক্ত করে দিয়েছে। পহেলা বৈশাখে কুটিরশিল্পের মেলায় নানা রকম খাদ্য-অখাদ্যকে অমৃত বলে মনে হয়েছে। বাঙালির এই শতবর্ষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আমরা আজীবন বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখিয়ে এসেছি ঔপনিবেশিক আগ্রাসনকে। আমাদের বাল্যকাল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমরা পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিলাম। কী এক বিচিত্র দেশ ছিল সেই পাকিস্তান! এক উদ্ভট দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই দেশ। যে ভদ্রলোক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, তিনি বলেছিলেন যে মুসলমানরা একটি জাতিগোষ্ঠী। অতএব অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে তাদের থাকা চলবে না। তাদের জন্য চাই ভিন্ন এক দেশ। অথচ তিনি নিজেও সম্পূর্ণ মুসলমান ছিলেন না। এটা ঐতিহাসিক সত্য। তিনি নিয়মিত মদ্য পান করতেন। বরাহ মাংস ভক্ষণ করতেন। জীবনে কোনো দিন নামাজ পড়েছেন বলে কেউ বলতে পারবে না। এমন এক ব্যক্তি কেবল ক্ষমতার লোভে একটি দেশের প্রধান হয়ে গেলেন। তাঁর এই দ্বিজাতিতত্ত্ব যে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ছিল, তা বুঝতে সময় নেয়নি জনগণ। সেই ১৯৪৮ সালেই ভাষার প্রশ্নে আন্দোলন শুরু করেছিল তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। তার পরের ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা। ক্রমেই আমরা পাকিস্তানের পূর্ব প্রদেশের মানুষেরা—মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সবাই মিলে এ দেশের মানুষের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র জন্ম দেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে এ দেশবাসী স্পষ্ট মত দেয় বাংলাদেশের পক্ষে। এবং তারপর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। এই যুদ্ধে ওই ধর্ম, নীতি এবং বিবেকভ্রষ্ট পাকিস্তানিদের পক্ষে কিছু বাঙালি কুলাঙ্গার এ দেশের মানুষের ওপর চরম অত্যাচার করে। এরাই আজকের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী। বিশ্বের সর্বত্র গণমানুষের মুক্তির যুদ্ধে যারা শত্রুপক্ষের হয়ে অন্যায়-অত্যাচার করে, তাদের শাস্তির বিধান করা হয় যুদ্ধের পর। আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই হিটলার ও তার সাঙাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হয় ন্যুরেমবার্গে এবং জীবিত ও মৃত অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হয়। কম্বোডিয়ায়ও একই ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়ার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়, কিন্তু এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের মাধ্যমে আমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করে বাংলাদেশের মুক্তির পেছনের সব আদর্শ ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে সেই পাকিস্তানিদের দোসররা আবার একটি প্রক্রিয়া শুরু করে, যাতে করে এই দেশ নব্য পাকিস্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই মাঝে দেশের মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। তারা সহজে এই চক্রান্তের কাছে পরাজয়বরণ করতে রাজি নয়। সর্বশেষ আজকে বাংলাদেশে অধিষ্ঠিত সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিধৃত যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করে আবার। এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরপরই আবারও সেই পাকিস্তানপন্থীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের লাখ লাখ তরুণ রাস্তায় নেমে আসে ও প্রতিবাদমুখর হয় ওই চক্রান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু চক্রান্ত থেমে থাকে না।


গণমানুষের যেকোনো দাবি উচ্চারিত হলেই ‘ইসলাম খাতরে মে হ্যায়’—‘ইসলাম বিপন্ন’ এই একটি ভণ্ডামির আশ্রয় পাকিস্তানিরা সব সময় নিয়ে এসেছে। আজও আমরা দেখতে পাই যে তাদের বাংলাদেশি দোসররা ওই একই স্লোগান দিয়ে গণমানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কেবল বিভ্রান্ত নয়, তারা সত্যনিষ্ঠ যুব সম্প্রদায়কে আঘাত করার চেষ্টা করছে এই অভিযোগ দিয়ে যে তারা নাস্তিক। এ অতি হাস্যকর একটি অভিযোগ। এবং আমরা সবাই জানি যে এ ধরনের সুবিধাবাদী কথাবার্তা ধোপে কখনোই টেকে না। একদিন বাংলাদেশের মানুষ রুখে দাঁড়াবেই এই ষড়যন্ত্রকে। শাস্তি হবেই যুদ্ধাপরাধীদের। বাংলাদেশ ফিরে পাবে তার হৃতগৌরব মুক্তবুদ্ধির দেশ হিসেবে।

তবে এই বৈশাখের খরদাহে যখন পারিপার্শ্বিকতা বড় উষ্ণ হয়ে উঠেছে, যখন নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, তখন আমাদের যাত্রাপথ খুব একটা মসৃণ হবে বলে আশা করা বোধ হয় ভুল হবে। ভরসা আমাদের একটি। বাঙালি হারতে জানে না। তাই সব ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াবে। দাঁড়াবেই।

লেখক : নাট্যব্যক্তিত্ব
কালের কণ্ঠ (৭ মে ২০১৬)

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাগল বাবার ভালোবাসা …..

১২ জুন ২০১৬ | 4697 বার

রতন সাহেবের কোরবানি ও আমাদের শিক্ষা

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 3580 বার

সাহায্য (ছোট গল্প)

০৫ আগস্ট ২০১৭ | 2234 বার

আমার গ্রামের ইতিকথা

০৯ জুলাই ২০১৬ | 2223 বার

বৃষ্টিপ্রেম (কবিতা)

১২ জুন ২০১৭ | 2197 বার

গোধূলির এই পথে

২০ আগস্ট ২০১৬ | 1969 বার

তবুও ফেলে আসা দিনগুলি মনে পরে যায়

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 1829 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১