শিরোনাম

প্রচ্ছদ নবীনগরের খবর, শিরোনাম, সম্পাদকীয়, স্লাইডার

করোনা জয় করার গল্প বলি আদৌ কি পারবো পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে

এস এ রুবেল | বুধবার, ০৩ জুন ২০২০ | পড়া হয়েছে 217 বার

করোনা জয় করার গল্প বলি আদৌ কি পারবো পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে

মার্চ মাস। দেশের বিভিন্ন স্থানে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার দুয়েকটা খবর শুনে ঠিকই আঁতকে উঠতাম। প্রতিনিয়ত ভয়ে বুক ধরফর করতো আর বুঝি রক্ষা নেই। আল্লাহর নিকট নতশিরে শুকরিয়া আদায় করছি এজন্য যে তিনমাস আগেও মনে হয়েছে আয়ু ফুরিয়ে এসেছে আমার।

ঠিক সে মহুর্তে মনেমনে আমি সহ আরো অনেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রতি বিরাগভাজন হয়েছিলাম। আক্রান্ত দেশ থেকে আসার পরে কোয়ারেন্টাইনে না গিয়ে উন্মুক্ত চলাফেরায় এই দেশে করোনা বীজ ছড়িয়ে দিলো। তাদের কি পরিবারের আপনজনদের প্রতি বিন্ধুমাত্র মায়া দয়া নেই এ প্রশ্নেও তাদের হেয় করেছি অনেক। অনেকে ফেসবুকে প্রবাসীদেরকে নিয়েও আজেবাজে মন্তব্য করে তাদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে দিয়েছি।


১ মার্চ থেকে ১৭ মার্চের মধ্যে শুধুমাত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসেছে ৮ হাজার ৯৭৪ জন প্রবাসী। এরা সবাই করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে আসায় বিষয়টি উদ্বেগজনক মনে করে সাথেসাথেই সরকারিভাবে তাদেরকে স্বইচ্ছায় ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়। আনুমানিক ৯ হাজার প্রবাসীদের মাঝে ১৪ জনের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত হয় ঠিকই বাকিদের উন্মুক্ত চলাফেরায় এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুকি ছিল বেশি।
এই ১৪ জনের মধ্যে ১২জনই ইতালি ফেরত বাকিরা সৌদি আরব ও ক্রোয়েশিয়া থেকে দেশে আসেন। বাকি প্রবাসীরা কি নিরাপদ ছিলো ! সাধারনত মানুষের এ প্রশ্ন আসাটায় স্বাভাবিক। তারাতো কোয়ারেন্টাইনে না থেকে লুকিয়ে দিন পার করতে থাকে। এতে করে ভয় আরো বেড়ে যায়।

এ কয়েকদিনে টিভিতে করোনার বিষয়ে অনেক কিছুই শেখার সুযোগ হয়। আক্রান্তদের সংস্পর্শে এ রোগ ছড়ায় বলে সতর্ক থাকতাম প্রবাসীদের কেউ যদি আক্রান্ত থাকে তারা যেন আত্মিয়দের বাড়িতে বেড়াতে না আসে। আমার মনে হয় সেসময় শুশুর বাড়িতে গিয়েও জামাইয়ের জন্য অনেকেরই বন্ধ ছিলো দরজা। এ পরিস্থিতিতে আমি আরো একটা বিষয় উপলব্ধি করেছি, দেশের মায়া ভুলে দুর প্রবাসে বছরের পর বছর আপনজনদের সুখের কথা ভেবে কাটিয়ে দেন এসব মানুষগুলো নিজেরাই যেনো একটা কষ্টের বাক্স। যে মানুষগুলো ইচ্ছে করলেই আদুরে গলায় ছেলেমেয়েদের বুকে জড়াতে পারেনা ইচ্ছে করলেই প্রিয়তমা স্ত্রীর সাথে দুষ্টুমির ছলে লক্ষি সোনা বা ময়না পাখি বলে ডাকার ইচ্ছের বাস্তবায়ন করতে পারেন না তারা আসলেই অনেক দুখি। এইসব দুখি মানুষের প্রানের মায়া আছে আমাদের মতোই। দেশে ফিরে যে পরিস্থিতিতে তারা পড়েছে আমার মনে হয় তাদের কাছে ওই মহুর্তে বেচে থাকাটাই যেন অতৃপ্তি ছিলো।

লকডাউনের শুরুর দিকে সন্ধ্যার আগেই রাস্তাঘাট একেবারে কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে যেতো। অনেকটা ভুতুরে পরিবেশের মতই ঘা ছমছমে রহস্যময় ঘোর সৃষ্টি করতো৷
একসময় মসজিদেও পাচজনের অধিক ব্যক্তির নামাজ পড়া বারন করা হলো। এইতো দুইমাস আগের কথা। তখন প্রতিটি মানুষের মাঝে মৃত্যু ভয় তাড়া করছে প্রতিনিয়ত। উত্তাল সাগরে জাহাজ ডুবার প্রাক্কালে যে অনুভূতি জ্বাগে ঠিক তেমনি দেশের প্রতিটি মানুষের একই ভাবনা আর বুঝি রক্ষা নেই। তখনো ইতালিতে প্রতিদিন পাচ থেকে ছয়শো লোকের মৃত্যুর খবর টিভির স্ক্রুলে দেখানো নিয়মিত ঘটনার মতো বিষয় ছিলো।
ম্যাসেঞ্জারে দিনে কয়েকবার আত্মীয় স্বজন শুভাকাঙ্ক্ষী ভয়েস মেসেজ পাঠাতো। ক্লিক করলেই সেই ভরাট কণ্ঠের সুরেলা আওয়াজ ‘তোমি এখনো নামাজ পড়না’ তুমি কি দেখোনা সব মসজিস বন্ধ হয়ে গেছে, তুমি ইচ্ছে করলেও আর নামাজ পড়তে পারবানা। বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, যতবারই এই রেকর্ড কানে বাজতো তখনি শিহরে উঠতাম।
মনেমনে ভাবতাম কিসের মোহে পড়ে এতোবছর কাটিয়ে দিলাম। মৃত্যুর পরে আত্মতুষ্টির জন্য কিইবা করেছি। এইসব ভাবনাগুলোর হিসাব মিলাতে পারিনা কখনোই।

প্রতিটি মানুষকে মরতে হবে এটা সবাই জানে। করোনায় আক্রান্ত না হলেও কিন্তু পৃথিবীর মায়া ছাড়তে হবে আমাদের। তাহলে কেন এই বেচে থাকার জন্য এতো আকুতি,এতো লুকোচুরি খেলা! এমনতো নয় করোনা থেকে বেচে থাকতে পারলেই আমরা অমর হয়ে যেতাম।
কখনো ভেবেছেন, সবাই স্রষ্টার নির্ধারিত নিয়ম অমান্য করে পৃথিবীর মায়ায় আটকে বাচার এই মিথ্যে আকুতি কেন করছি!
বেচে থাকার এ বৃথা চেস্টায় সফলতা একেবারেই শুন্যের কোঠায় জেনেও প্রাণপণ লড়াইয়ের স্বার্থকতা কোথায়।
আমি দেখেছি গ্রামের সহজ সরল ৭০ থেকে ৮০ বছরের অনেক বৃদ্ধ মুখে মাস্ক লাগিয়ে বাজার করতে আসে। তারা আদৌ কি ভাইরাসমুক্ত থাকতে মুখে মাস্ক লাগিয়েছে। নিম্নমানের মাস্ক কিংবা মুখে লাগানোর নিয়ম না জানলে ব্যবহারের কি দরকার। শুধুমাত্র বয়সে প্রবীন নয় উঠতি বয়সের অনেকেই মাস্ক লাগিয়ে এখানে সেখানে যাচ্ছে তারাও কি শুধুমাত্র মাস্ক ব্যবহার করে ভাইরাসমুক্ত থাকতে পারবে৷
আমি বেশ কয়েকদিন আগে এক ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে উল্লেখ করেছি, পাবলিক মাস্ক লাগায় পুলিশের লাঠির ভয়ে, করোনার ভয়ে নয়!
মাস্ক ব্যবহারের কিছু নিয়ম কানুন রয়েছে, মাস্কের কোয়ালিটিও দেখতে হবে, কপালে চশমা লাগালে যেইরকম সেরকম ভাবে মাস্কের ব্যবহারে আপনিও অনিরাপদ। আমি এখনো দেখি প্রতিটি মানুষের মাস্ক ব্যবহার করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। এ সংক্রমণ কাছাকাছি আক্রান্তের সংস্পর্শে হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র থেকেও ছড়াতে পারে৷ আমাদের চলাফেরায় আদৌ কি সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখছি। ঘরে থেকে দেড়মাস মাস কি দুইমাস কাটিয়ে চুলদাড়ি বড় করলাম। অনেকেই মাথা ন্যাড়া করে বিশ্বজয়ের আনন্দে ডিগবাজি খেতে দেখেছি।

যা বলছিলাম, নবীনগরের এক সিনিয়র সাংবাদিক এক্কেবারে লকডাওন পক্রিয়ায় দেড়মাস ঘরে থেকেই কাটিয়ে দিয়েছেন। আমাকে প্রায়ই পরামর্শ দিতেন। সেইফ থাকার কথা বলতেন। অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে মানা করতেন৷ আমি বাজারে গিয়ে দেখি কারো মাঝে আতংকের রেশবালাই নেই। যে যার মতো ঘষাঘষি করেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিচ্ছেন৷ এসব দেখে ভয়ে আতকে উঠি!
আচ্ছা, দুইমাস হোম কোয়ারেন্টাইনে থেকে যখন কেউ ঘর থেকে বের হবে তখন আশপাশের অসচেতন ব্যক্তিরা যারা এই কয়েকদিন এখানে-সেখানে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে এলো ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে থেকে সচেতন ব্যক্তিরা কি ছাড় পাবে? নিশ্চয় নয়।
আমরা শুরুতেই ভুল করেছি, সামাজিক দুরত্বের সংজ্ঞা জানিনা বলে জনসমাগম এড়িয়ে চলতে পারিনি। শুরুতেই চোখের সামনে মানুষ মরতে দেখিনি বলে আমাদের কিছু হবেনা ভাবতে শুরু করি। যেখানে করোনা সারাবিশ্বকে স্পীডব্রেক কষার মতো স্তম্ভিত করে দিয়েছে সেখানে আমাদের দেশে দরিদ্রদের ত্রানের চাল চুরি করে বিত্তবানদের ঘরে জমা রাখতে দেখি। যেখানে মৃত্যুভয়ে মানুষের নীর্ঘুম রাত কাটে গভীর রাতে আল্লাহর করুণা পেতে সকল মসজিদে আজান দেয়া হয় সেদেশে চাল চুরির ঘটনাগুলো এদেশের জন্য লজ্জাজনক এক অধ্যায় হয়ে থাকবে।
মানব সৃষ্টির শুরু থেকে মৃত্যু নিশ্চিত জানি তবে আদৌ কি মৃত্যুর ভয় আমাদেরকে ভীত করতে পারে। যখন মৃত্যু আমাদের অতি সন্নিকটে বুঝতে পারি তখন নিজেকে মানুষ হিসাবে ভাবতে থাকি। এর আগে মনুষ্যত্ব লোপ পেয়ে হিংস্র হয়ে উঠি। অন্যের আহার কেরে নিজের মুখে দেই।
তেমনি করোনাভাইরাস আমাদের জন্য অতি নিকটে মৃত্যুর ম্যাসেজ নিয়ে আসছে। এইযে অল্প আয়ুর সতর্কবাণী আমরা কি আসলেই সতর্কতা অবলম্বন করছি না কোন রহস্যের ঘোরে আছি ভাবুন তো। এর আগে আমাদের আশপাশের মানুষজনের দিকে তাকায়, চালচলন, আন্তরিকতা, মহানুভবতা দিয়ে কতজন নিজেদের সুদ্ধ করার চেস্টা করেছি। মসজিদ বন্ধ কেন প্রতিবাদী হয়েছি কখনো মসজিদমুখী হবার চেস্টা করিনি।
কারো যখন অন্তিম প্রয়ান ঘটে তখন সে অসহায়ের মতো ভাবতে থাকে। কেন সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেও আশপাশের মানুষজনের সহযোগিতা করিনি। কেন কোন ভালো কাজের মাধ্যমে পুন্যের তালিকা দীর্ঘ করিনি। দুর্ভাগ্য, ঠিক ওই মহুর্তের ভাবনায় কিচ্ছু আসে যাবেনা।
দুইমাসের বেশি সময় লকডাওন ভেঙে দোকানপাট খোলা হয়েছে। সাথে ব্যাংকের লেনদেনও। ধীরেধীরে গণপরিবহন রাস্তায় সচল হচ্ছে। আস্তে আস্তে অফিস আদালত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবকিছুই আগের মতো স্বাভাবিক হতে যাচ্ছে। আমি জানি অনিশ্চয়তার হিসেবে লকডাওন স্থায়ীত্ব হবেনা। একসময় খোলে দিতে হবে। দিয়েছেও। আমরা কি লকডাওন ভেঙ্গে দোকান খোলার স্বীকৃতি পেয়েছি বলেই করোনার ঝুকি থেকে বেচে গেলাম এমন ভাবছিনাতো। তানা হলে মানুষজনের চলাচলে সচেতনতা কোথায় বলতে পারেন। অনেকেই ঈদের পরে লকডাওন খুলায় বেড়ানোর আশাটাও বাস্তবে রুপ দিয়েছেন।
করোনা আক্রান্তদের তালিকায় মনে হচ্ছে
হুড়মুড় করে বাজারে, মার্কেটে আসার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ব্রাহ্মনবাড়িয়ার কথা বলি,
জেলায় (নয়টি থানা সহ) ৩০,৩১ মে, ১লা জুন এই তিনদিনে নতুন একজন করোনা আক্রান্ত হন। এর পরের দিন ২ মে অর্থাত গতকাল ৪০ জনের করোনা পজেটিভ এসেছে। হঠাত করে এতজনের করোনার খবর কিন্তু উদ্বেগজনক।

এখনি ভাবতে হবে দুই মাস আগে যে ভয় ছিলো মনে এর বাস্তবরুপ দেখার বুঝি আর বেশি দেরি নেই। প্রতিদিন ৩ হাজার কিংবা ৪ হাজার হলে মাসে সারাদেশে করোনা আক্রান্ত হবে লাখের উপরে। এদের সংস্পর্শে আরো এক লাখ আক্রান্ত হবে এটাই সিম্পল হিসাব। যেখানে ডাক্তাররা নিরাপত্তা সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) লাগিয়েও আক্রান্ত হচ্ছেন সেখানে আপনি আমি কোন অদৃশ্য শক্তির অধিকারী যে বীরদর্পে এভাবে চলার সাহস দেখায়। কেন জানি মনে হচ্ছে সারা বিশ্বের ভয়াবহতা কমে গেলেও এ দেশের করুণ চিত্র দেখার অপেক্ষায় আছে জাতি। চলতি সময়ে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার তেমন কোন অস্বাভাবিক মনে না হলেও একসময় তালিকা এতোটাই দীর্ঘ হতে পারে তখন কিন্তু চিকিৎসার অভাবে কিংবা গাফিলতির কারনে লাশের মিছিল গুনার লোক থাকবেনা।

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 25316 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১