শিরোনাম

প্রচ্ছদ নবীনগরের খবর, শিরোনাম, স্লাইডার

খারঘর ট্র্যাজেডি: ১০ই অক্টোবর, ১৯৭১।

জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন। | বুধবার, ১০ অক্টোবর ২০১৮ | পড়া হয়েছে 592 বার

খারঘর ট্র্যাজেডি: ১০ই অক্টোবর, ১৯৭১।

কি ঘটেছিল সেদিন !
মুক্তিযোদ্ধা মো: শাহজাহান মিয়া অসুস্থ। ঠিকমত কথা বলতে পারেন না, থেমে থেমে নিজ গ্রামের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কথা বলতে গিয়ে উত্তেজনায় কেঁপে উঠছিলেন। তাঁর চোখ বারবার সিক্ত হয়ে পড়ছিল। খারঘর ! নবীনগর উপজেলার বড়াইল ইউনিয়নের একটি গ্রাম। প্রত্যন্ত, সবুজ ও নিরিবিলি।

তারিখ ১০ই অক্টোবর ১৯৭১ সাল। একটি প্রভাত। খারঘরের একটি রক্তাক্ত প্রভাত। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে বর্বর পাকিস্তানী পিশাচের দল গ্রামটিতে নজীরবিহীন গনহত্যা চালায়। অথচ এর আগেরদিনও সূদুর পল্লীর ছোট্ট এই গ্রামটিতে ছিল মানুষের কোলাহল, আজানের ধ্বনি। পরেরদিন সকালে যেন এক মৃত্যুপূরি। ভোরের দিকে পাক হায়েনারা বৃষ্টির মত গুলি করতে করতে ঢুকে পড়ে গ্রামটিতে। যাকে সামনে পেল তাকেই গুলি করল, সমানে চলল হত্যাযজ্ঞ, লুন্ঠিত হল খারঘর, ছাই হয়ে গেল বাড়ীর পর বাড়ী। সেদিন ৬ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ ৪৬ জন নারী পুরুষ শহীদ হন, আহত হলেন শতাধিক। বিকালে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের আত্বীয়-স্বজনদের সহায়তায় মৃতদের কবর দেওয়া হয়। সেসময়ে বড়াইল ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ কমান্ডার আল-মামুন সরকার (বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ- ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা)। চলুন তাঁর নিজ বয়ানে শুনি সেদিনের খারঘর ট্র্যাজেডি’র কিছু কথা।


‘………৯ই অক্টোবর রাতে আমি ও সেকশন কমান্ডার সারওয়ার্দী খারঘর অগ্রবর্তী ক্যাম্পে ঘুমিয়েছিলাম। ভোরে অল্প কোয়াশার মধ্যে পার্শ্ববর্তী নদীতে লঞ্চের শব্দ পেতেই আমরা সতর্ক হয়ে যায়। খারঘর ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের পাকবাহিনীকে প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়ে আমি দ্রুত বড়াইল ক্যাম্পে চলে আসি। খারঘরে মুক্তিযোদ্ধারা ৩টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পজিশন নেয়। লঞ্চটি নদীর পাড়ে ভিড়িয়ে শতাধিক পাক সৈন্য খারঘরের নিকট বড়াইল খালের মোহনায় পৌছে যায়। ছিপছিপ পানিতে ধানক্ষেতের আইলে পজিশন নিয়ে এলোপাথারি গুলি করতে থাকে। এরই মধ্যে আমিসহ সহযোদ্ধারা বড়াইল ক্যাম্প থেকে ফায়ার ওপেন করি। আমাদের আক্রমণের তীব্রতা অনুধাবন করে পাক আর্মি বড়াইল প্রবেশের চিন্তা বাদ দিয়ে দ্রুতগতিতে খারঘরে ঢুকে পড়ে। এবং সেখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের কে চারদিক থেকে ঘিরে আক্রমণ করতে থাকে। স্বল্প প্রশিক্ষিত আনসার সদস্যরা অসীম সাহসের সাথে সেই আক্রমণ মোকাবেলা করে। অবশ্য বিজয়ী হতে পারেনি। বীরের মত লড়াই করে শহীদ হন তাঁরা। তাঁদের পূন্য রক্তে ভেসে যায় খারঘরের মাটি।

আর নিরীহ গ্রামবাসীর কথা কি বলব’! চতূর্দিকে বর্ষার পানি ও প্রচন্ড গুলিবর্ষণের মাঝে খুব কম সংখ্যক মানুষই নিরাপদে পালাতে পেরেছিল। বাকিরা নিজ নিজ বাড়ীর আশেপাশে ঝোঁপ-ঝাড় ও ধানক্ষেতে লুকিয়েছিল। বড়াইল বাজার থেকে আমরা শুধু তীব্র গুলিবর্ষনের আওয়াজ, মানুষের আহাজারি, পশু-পাখির করুন চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। আগুনের লেলীহান শিখা ও ধোয়ার কুন্ডলীও দেখা গিয়েছিল। প্রায় এক ঘন্টা পর সারওয়ার্দী ও তাজুল কাঁদামাখা অবস্থায় দৌড়ে এসে জানাল’….পাক বাহিনী দুইভাগে বিভক্ত হয়ে একদল খারঘরে ঢুকে ব্রাশফায়ার করছে, অপর দলটি ধানক্ষেতের মধ্যদিয়ে বড়াইলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এরকম একটি দু:সংবাদে আমরা হতভম্ব হয়ে পড়ি, দ্রুত বড়াইল বাজার-খালের দক্ষিন পাশের কয়েকটি বাড়িতে পজিশন নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। এদিকে বেলা বাড়তে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক দৃষ্টি, বন্দুকের ট্রীগারে আঙ্গুল।

আনুমানিক বেলা ১০টা নাগাদ পাকবাহিনীর ৩০-৪০ জনের একটি দল বড়াইল-বাজার পুকুরের উত্তর পাড় দিয়ে দ্রুত বাজারে প্রবেশ করে। তখন আমাদের পজিশন থেকে পাকবাহিনীর দুরন্ত মাত্র কয়েকশ গজ। তাৎক্ষনিকভাবে আমি এস.এম.জি দিয়ে ব্রাশফায়ার শুরু করি, সাথে সাথে আমার সহযোদ্ধাদের অস্ত্রও এক সঙ্গে গর্জে উঠে। এই ঝটিকা আক্রমণে বাজারের বিভিন্ন দোকানের পিছনে লাফিয়ে পড়ে পাকবাহিনী আত্মরক্ষা করে, এবং তরিৎ বাজারের পূর্বপাড়ে একটি হিন্দু বাড়ীতে পজিশন নিয়ে পাল্টা গুলি চালায়। নিমেষে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। মুখোমুখি যুদ্ধ। প্রচন্ড গুলাগুলিতে গোটা এলাকা প্রকম্পিত । ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি, মর্টারের গোলাবর্ষণ, বারুদের পোঁড়া গন্ধ। জীবন মৃত্যুর সন্দিক্ষণে দাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকেন। কিছুক্ষন পরেই পাকবাহিনী রণে ভঙ্গ দেয়, দুই ইঞ্চি মর্টারের কাভারিং গোলাবর্ষন করতে করতে লঞ্চ দিয়ে দ্রুত পশ্চাদসরন করে।

মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ প্রতিরোধের ফলে সেদিন বড়াইলে কোন ক্ষতি করতে না পারলেও, ইতিহাসের নৃশংসতম ও পৈশাচিক হত্যাকান্ড সংঘটিত হয় খারঘর গ্রামে। দুপুর ১২টা নাগাদ খারঘরে পৌছে দেখি সমস্ত গ্রাম যেন এক শ্মশানপুরি। যেদিকে তাকাই শুধু লাশ আর লাশ। রক্তে রন্জিত লাশ। পিতার লাশ, মায়ের লাশ, শিশুর লাশ, বোনের বিকৃত বীভৎস লাশ। গত রাতে কৈ মাছ ভাজা দিয়ে যে মহিলা মাতৃস্নেহে আমাদেরকে ভাত খাইয়েছিল, সহযোদ্ধা শাহজাহনের সেই মহিয়সী মায়ের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উঠোনে পড়ে আছে। তাঁকে শুধু গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি বেয়নট দুয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। সেদিন খারঘরের প্রতিটি বাড়ীতে ছিল স্বজন হারানোর গগনবিদারী কান্নার আওয়াজ। শহীদদের কাফনের কাপড় নেই, আহতদের সু-চিকিৎসা নেই। এ এক অবর্ণনীয় দৃশ্য……..’।

‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে,
কত প্রাণহল বলিদান
লেখা আছে অশ্রুজলে’।

নবীনগর তথা পুরো মুক্তিযুদ্ধের আখ্যানে ভয়াবহ নির্মম ও নিষ্ঠুর এক গনহত্যা পরিচালিত হয়েছিল খারঘর গ্রামে। এই হত্যাকাণ্ড এতটা লোমহর্ষক ছিল যে’ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও খারঘরের নারী-পুরুষ নিধনের কাহিনী শুনলে শিউরে উঠতে হয়। আজও পাগলী নদীর দুকূল ছাপানো জলরাশি বয়ে নিয়ে চলেছে ইতিহাসের ঘৃণ্যতম এক ক্ষতচিহ্ন। আজও শরতের রাতে মজলুমের আর্তচিৎকার, শহীদের কান্না শিশির হয়ে ঝরে পরে খারঘরের কাশফুলে! দূর্বাঘাসে !!

আজ ১০ই অক্টোবর। ভয়াল স্মৃতিময় খারঘর গনহত্যা দিবস। এই দিনে সকল শহীদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। যাঁদের ত্যাগে দেশ আজ স্বাধীন।

28685257_1800477386692311_1968800155007400288_nঋণী:
>> মু্ক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিয়া, খারঘর- সাক্ষাত্কার ।
>> মুক্তিযোদ্ধা আল-মামুন সরকার- সাক্ষাত্কার।
>> জয়দুল হোসেন- লেখক, মুক্তিযুদ্ধে ব্রাক্ষণবাড়িয়া গ্রন্থ।
>> বিশ্বজিৎ পাল – কালের কন্ঠ ব্রাক্ষণবাড়িয়া।
>> আবু কামাল খন্দকার। প্রাক্তন সভাপতি, নবীনগর প্রেসক্লাব।
>> বন্ধু সুমেন/হানিফ/রুনু- সফরসঙ্গী খারঘর।

গ্রন্থনা : জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন।

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 25659 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১