শিরোনাম

প্রচ্ছদ শিরোনাম, সাহিত্য পাতা, স্লাইডার

গোধূলির এই পথে

মুহাম্মদ মনিরুল হক | শনিবার, ২০ আগস্ট ২০১৬ | পড়া হয়েছে 1971 বার

গোধূলির এই পথে

দিন দিন আমার চেহারায় মনে হয় ফকির ভাবটা প্রকট হয়ে উঠছে। শুধু চেহারা নয় স্বভাবটাও হয়ত ভিখারীদের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। আগে এমন মনে হতনা, ইদানিং বন্ধু বান্ধবের আড্ডা বা কোন উৎসবে গেলে ব্যাপারটা খেয়াল করি। তবে এ বিষয়ে আমি তেমন চিন্তিত না। আমার চিন্তা অন্য বিষয়ে। দীনতার পাশাপাশি আমার চেহারায় হয়ত ভীতু ভাবটাও ফুটে উঠছে। আমি এই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চেহারায় একটা ভয়ংকর ভাব ধরে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু কোন কাজ হয় না। কিভাবে যেন আসল চেহারাটা ফুটে উঠে। সেদিন এক শো রুমে ঘুরে ঘুরে শার্ট দেখছিলাম। আমি যে শার্টটা দেখছিলাম বিক্রয়কর্মী এসে সেটা ধরে বলল,
নিবেন এটা?
আমি বললাম, না।
বিক্রয়কর্মী আরেকটা শার্ট দেখিয়ে বলল, ঐটা নিবেন?
আমি মাথা ঝাকি দিয়ে অসম্মতি জানালাম।
এবার লোকটা ঝাঝালো গলায় বলল, তাহলে কোনটা নিবেন?
দেখি নেব একটা। -একটা যে নিবেন এখানকার কাপরের দাম জানেন? আমরা পাবলিকের চেহারা দেখলেই বুঝতে পারি, কে কাপর কিনতে আসে কে চেহারা দেখাতে আসে।
আমি বললাম, ভদ্রভাবে কথা বলুন। কথার মাঝে আমি একটু উত্তেজনা প্রকাশের চেষ্টা করলাম। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হল আমার বুকের ভিতর একটা শীতল বাতাস বয়ে গেল যেন শত চেষ্টা করেও আমি আর স্পষ্ট করে একটি কথাও বলতে পারব না। আমি চেহারার মধ্যে একটা রাগ রাগ ভাব নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম। তার পরে আমি বহুবার এই ছেলেটাকে মেরেছি কল্পনায়। শুধু মেরেছি না ভয়ংকরভাবে মেরেছি। আমি কল্পনায় অনেককেই মারি। কল্পনায় ঠান্ডা মাথায় অনেক খুনও করেছি। ঠান্ডা মাথায় খুন সবাই করতে পারেনা। আমি পারতাম, আমার মনে হত, আমি কল্পনায় যাদের খুন করতাম, মরার আগ মহুর্তে তাদের ভীত মুখখানা দেখে আমার হাসি পেত।  আমার মনে হয় একজন নিরীহ মানুষ কল্পনায় যতগুলো খুন করে একজন সাহসী মানুষ বা ক্ষমতাবান মানুষ তা করে না। সেক্সপিয়র থাকলে হয়ত এই বিষয়ে নতুন কোন থিউরি বানিয়ে ফেলতেন।

shuptho-1446988482-0ccf8cd_xlarge


আমার বন্ধু বাবু আবার আমাকে নিরীহ মানতে রাজী না। সে বলে তুই শালা ভন্ড। নিরীহ টাইটেল লাগিয়ে তুই ভং ধরে থাকিস। তোর মত সুবিধাবাদী মানুষের সংখ্যা এই দেশে কম না। আমি তার কথার যৌক্তিকতা খুঁজিনা। সবার ভাবনায় মিল থাকবে এমনতো নয়।

পৃথিবীর সবার সাথে কথা বলতে আমার বুক কেঁপে উঠলেও একজনের কাছে কিন্তু আমি সাহসী। সে হল রুহি। সেদিন রুহি ফোন দিয়ে বলল, আচ্ছা জামিলভাই, আমার কথা তোমার কখন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে? তৎক্ষনাত যেন আমার শিরদাড়া সোজা হয়ে গেল।
কর্কষ গলায় বললাম, মানে কি?
রুহি উচ্ছ্বাসিত গলায় বলল, তুমি যখন রাস্তায় হাটাহাটি কর তখন আমার কথা বেশি মনে পড়ে নাকি যখন বাসায় থাক তখন বেশি মনে পড়ে?
আমি গুরুত্বহীনভাবে বললাম, ঠিক করে বলতে পারবনা।
তবে বড় বাথরুম করার সময়ই তোর কথা বেশি মনে পড়ে হয়ত।
রুহি রুক্ষ গলায় বলল, জামিল ভাই সবকিছুতে রসিকতা করার চেষ্টা করবেনা। রসিকতা করার জন্য যে পরিমাণ আই কিউ প্রয়োজন তোমার তা নেই।
অন্য কেউ হলে হয়ত এই কথায় আমি দমে যেতাম। কিন্তু রুহির সাথে কথা বলার সময় আমি অন্যরকম একটা চঞ্চলতা অনুভব করি।
আমি বিরক্তি প্রকাশ করে বললাম সবসময় কেন এত বিরক্ত করিস। রুহি আমার বিরক্তির ধার দিয়েও গেলনা। সে তার মতই আহ্লাদী গলায় বলল, আমি মজার একটা বিষয় বের করেছি। চলতি পথে বা কাজের মধ্যে যদি আমার কথা তোমার বেশি মনে পড়ে তাহলে বুঝতে হবে আমার প্রতি তোমার আকর্ষণটা মানষিক। আর যদি বিছানায় শুয়ে থাকার সময় আমার কথা তোমার ভাবনায় বেশি আসে তাহলে বুঝতে হবে ব্যাপারটা দৈহিক।

-কি বিশ্রী তাইনা।
-কেন, বিশ্রী হবে কেন?
-শরীরের কারনে একজন আরেকজনের প্রতি আকর্ষণবোধ করছে ব্যাপারটা কি ভয়ংকর না?
-কেন, ভয়ংকর হবে কেন?
-তুমি এগুলো বুঝবেনা। মানুষের আসল সুন্দর্য হচ্ছে মনে। যার মন সুন্দর তার সব সুন্দর। মানুষ আকর্ষিত হবে সুন্দর মন দ্বারা শরীরে নয়।
-রুহি আমার একজন ভাল মনের মানুষের সাথে পরিচয় আছে। অত্যাধিক বড় মন তার। পল্টন মোড়ে ভিক্ষা করে।
-ভিক্ষা করে মানে!
-এমন ছ্যাৎ করে উঠলি কেন? দেহের ব্যাপারটা যেহেতু তোর কাছে তুচ্ছ। অর্থ সম্পদের ব্যাপারটাও তুচ্ছ হওয়া বাঞ্চনীয়। মূল কথায় আসি লোকটার মনের মত বড় মন এই দেশে বিরল। লোকটার শুধু দুটি পা নেই। আমার সাথে ভাল জানাশুনা আছে। সেদিন আমাকে চা খাওয়াল। আসার সময় রিক্সা ভাড়া দিয়ে দিল। আমার কথার মাঝেই রুহি কখন ফোন রেখে দিয়েছে বুঝতে পারিনি। সেদিন আর রুহি আমার কর্মজীবন আর ছোট ভাইয়ের টাকায় চলার কথা বলে ঘায়েল করার সুযোগ পায়নি। রুহির কথার আঘাতে আর বন্ধু বাবুর সহায়তায় একটি পত্রিকায় খন্ডকালিন একটা কাজ পেয়েছিলাম। আমার প্রথম কাজ পড়ল বস্তির মানুষের জীবন নিয়ে একটা প্রতিবেদন দেয়া। এক সপ্তাহ ঘুরে ঘুরে আমি একটা প্রতিবেদন দিয়েছিলাম কিন্তু ছাপা হয়নি। ছাপা না হওয়ার কারণটা পরে জানলাম। পত্রিকা অফিস থেকে জানানো হয়েছে আমার প্রতিবেদনে নাকি স্ত্রী নির্যাতনের ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে উঠে এসেছে। যে কেউ প্রতিবেদনটা পড়লে মনে করবে স্বামীর হাতে স্ত্রীরা মার খাবে এটাই স্বাভাবিই। ব্যাপারটা অবশ্য আমার কাছে তেমন অস্বাভাবিকও মনে হয়না। খুব ছোটবেলায় হয়ত অস্বাভাবিক লাগত। ক্লাস থ্রী বা ফোরে পড়ার সময় একদিন বন্ধুদের সাথে মারামারি করে শার্ট ছিড়ে গিয়েছিল। মায়ের হাতে মার খাওয়ার ভয়ে বাড়ি না গিয়ে যাদের সাথে মারামারি করেছি তাদের সাথেই আমবাগানে খেলায় মেতে রইলাম।

imagesবেলা প্রায় পড়ে আসছে এমন সময় দিপু এসে বলল, ভাইয়া আম্মারে মারতেছে। আম্মারে মারছে বলার সাথে সাথেই বুঝে ফেলেছি কে মারছে। এই কথা শুনার পর আনন্দের বিকালটার হঠাৎ নিষ্ঠুর সন্ধ্যা হয়ে যাওয়া দেখা ছাড়া তখন আর কিছু বলার থাকত না। আমার ছোটভাইকে কে বুঝাবে বাবা মাকে মারছে এটা দেখার চেয়ে এই সংবাদ শুনাটা কত বাকরুদ্ধকর। মাকে বাবা প্রহার করত। প্রায় প্রতিদিনই মারত। কিন্তু মায়ের আগেই হঠাৎ করে বাবা মরে গেল। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের চালচলন দেখে মনে হওয়াটা স্বাভাবিক যেন মা আগেই জানতেন বাবা মারা যাবে আর তাকে জীবনযুদ্ধে নেমে পড়তে হবে। বাবার মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই আমার মা ঘরের কোণের গৃহিনী থেকে হঠাৎ করে বাড়ি বাড়ি কাজ করা মহিলা হয়ে উঠলেন। আর আমাদের প্রতি কেমন যেন মারমুখী হয়ে উঠলেন যেমনটা তিনি আগে ছিলেন না। দিপুকে প্রায় প্রতিদিনই মারতেন পড়াশোনার জন্য। তাতে তেমন লাভ হয়নি। একদিন অতিরিক্ত মাত্রায় মারলেন। দিপু জন্তুর মত ঘুঙাতে লাগল। মা কিন্তু দমে যাননি। হুংকার ছেড়ে বলেছেন, পড়ালেখা করবি, না করবি না? দিপু প্রায় অবচেতন অবস্থায়ই অস্পষ্ট কিন্তু দৃঢ় কন্ঠে বলল, আমি আর কখনো স্কুলে যাবনা। মায়ের সব রাগ যেন দিপুর উপরই ছিল। আমাকে কখনো মেরেছেন বলে মনে পড়েনা। কিন্তু সেদিন অগ্নিচোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আর তুই? আমি কিছু বলতে পারিনি সেদিন। জগতের উল্টা নিয়মে আমার ছোট ভাইকে কাজে লাগিয়ে আমাকে রাখা হল জাতির মেরুদন্ড সোজা রাখার কাজে। মায়ের রক্ত পানি করা টাকা আর ছোট ভাইয়ের আয়ের টাকায় আমার পড়াশুনা চলে। মা কাজ করে এ বাড়ি ও বাড়ি। দিপু কয়েকদিন কোন চা স্টলে কয়েকদিন কোন বেকারীতে। প্রথম ঢাকায় আসার পর দিপু আমাকে মাসিক ছয়শ টাকা করে দিত। এখন মাসে দুই হাজার দেয়। আমার মনে হয় আমি যদি কখনো কোন ভাল কাজ পেয়ে যাই বা কখনো অনেক টাকার মালিক হয়ে যাই তখনো দিপুর টাকা দেওয়ার অভ্যাসটা থেকে যাবে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি ইচ্ছা করলে অনেক টাকার মালিক হতে পারব। কিন্তু এখন আমি অনেক টাকা দিয়ে কি করব। মফস্বল শহরে বড় অফিসারদের রান্না করতে গিয়ে মাকে যে গ্লানি আর অপমান সহ্য করতে হয়েছে তা কি আমি মুছে দিতে পারব। কাপ ভাঙার অপরাধে দিপুর পায়ে যে গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়েছিল তার জ্বালা কি এখন আর নিবারণ হবে। এখন আর মায়ের সামনে গিয়ে দাড়াতে ইচ্ছা করেনা আমার। এর পিছনে কোন লজ্জাবোধ বা অস্বস্তি আছে বলে আমার মনে হয়না। দিপুর এত ত্যাগ এবং কষ্টের পরও মা কেন জানি আমার প্রতি অতিমাত্রায় দুর্বল। দিপুরও যেন এই ব্যাপারে কোন অভিযোগ নেই। চিরকাল সে মায়ের কাছ থেকে দূরেই থেকে গেল। আমি বাড়িতে গেলে মা আমাকে নিয়ে অতিমাত্রায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শুধু মা নয় পৃথিবীর সব নারীরই হয়ত অপদার্থ ছেলেদের প্রতি অতিরিক্ত রকমের সহমর্মিতা থাকে। সেবার যখন বাড়িতে গেলাম। অনেকদিন পর স্কুল জীবনের এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল। বন্ধুটি বলল, জামিল, আম্মা তোর কথা বলেরে। স্কুলে পড়াকালিন সময়ে একবার কি দুইবার বন্ধুটির বাড়িতে গিয়েছিলাম। এতকাল পরেও মহিলা আমার কথা মনে রেখেছে। বন্ধুর মায়ের এই ভালোবাসা আমার ভিতর সেদিন কি এক সুখকর যন্ত্রণার সৃষ্টি করেছে আমার বন্ধুটি কখনো বুঝবেনা। বন্ধু কেন কেউ জানবেনা অপদার্থের জন্য পৃথিবীতে কত রকমের যন্ত্রণা আছে। সব যন্ত্রণার রংও এক না। রুহির জন্যও আমার কষ্ট হয়। রুহির জন্য হল ঘরে বন্দী হওয়ার যন্ত্রণা। রুহিকে কে বুঝাবে ঘরে বন্দী হবার তাড়না থেকে ঘরছাড়া হওয়ার সুখকর যন্ত্রণা আমার বেশি। সুখের যন্ত্রণাগুলো যখন আমাকে ভর করে তখন জগৎ সংসারের সম্পর্ক যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তখন মনে হয় চলন্ত এক ট্রেন আমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার পিছনে ফিরে তাকাবার কিছু নেই। আমি শুধু সামনে তাকিয়ে সন্ধ্যার কুয়াশাভেজা গ্রামগুলো দেখে দেখে চোখ ভেজাব।

13631521_758859767550419_7665857578089958656_nলেখক মুহাম্মদ মনিরুল হক

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 25659 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১