শিরোনাম

প্রচ্ছদ জেলা সংবাদ, শিরোনাম, স্লাইডার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লিচু বাজার

দাম কম তাই পাইকারদের উপচে পড়া ভীড়

ডেস্ক রিপোর্ট | বুধবার, ১৮ মে ২০১৬ | পড়া হয়েছে 1186 বার

দাম কম তাই পাইকারদের উপচে পড়া ভীড়

ভোর ৪টা থেকে লিচু নিয়ে বসে আছেন খলিল মিয়া। নিয়ে আসার পর পর বেশ কয়েকবার দরকষাকষি হয়েছে। এখন আর কেউ কাছে ভিড়ছে না। সকাল ৮টার দিকে এক ক্রেতাকে হাত ধরে টেনে অন্তত কিছু একটা বলার আকুতি তাঁর। এক হাজার ৭৫০টি লিচুর দাম দুই হাজার ৫০০ টাকা। ক্রেতা এক হাজার ৩০০ টাকা বলতেই বিক্রি করে দিলেন, যা আগের অর্ধেক। দাম কম পাওয়ায় ভিটি দাউদপুর গ্রামের খলিল ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আর নি লিচু চাষ করুম।’

চাষিদের কাছ থেকে লিচু কিনে সিদ্দিক ভূঁইয়া বিক্রি করেন বাজারে আসা পাইকারের কাছে। ভোররাতে তিনি এক হাজার ৮০০ লিচু কেনেন তিন হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে। লাভ তো দূরের কথা, ঘণ্টা তিনেক পর ৫০০ টাকা কমে তিন হাজার টাকায় তিনি লিচুগুলো বিক্রি করেন। গোয়ালনগর গ্রামের সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ‘সবাই মিল্লা মনে অয় এক দিনেই সব লিচু বাজারে লইয়া আইছে। বেলা বাড়তে বাড়তে লিচুর দাম গেছে কইম্মা।’


এ হালচাল গতকাল সোমবার আউলিয়া বাজারের। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর থেকে বিজয়নগর উপজেলার ওই বাজারের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। লিচুর রাজ্য হিসেবে পরিচিত বাজারটিতে ভোর সাড়ে ৫টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত অবস্থান করে লিচু বিক্রির এ হালচাল চোখে পড়ে। ওই কয়েক ঘণ্টায় বাজারটিতে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার লিচু বিক্রি হয় বলে ধারণা পাওয়া যায়।

তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারটিতে লিচুর দাম কমতে থাকায় বিক্রেতাদের মধ্যে হতাশা নেমে আসে। লিচুর পরিমাণ বেশি হওয়ায় সকাল ৭টা-সাড়ে ৭টার বদলে সাড়ে ৯টা নাগাদ বিকিকিনি চলে বাজারটিতে। ১০০ লিচু সর্বোচ্চ ২৮০ টাকা এবং সর্বনিম্ন ৬০ টাকা দরে লিচু বিক্রি হতে দেখা যায়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গত এক সপ্তাহের মধ্যে গতকালই সবচেয়ে বেশি লিচু ওঠে বাজারে। বৃষ্টির কারণে গাছ থেকে লিচু ঝরে পড়ছে বলে চাষিরা দ্রুত বিক্রি করে দিতে চাইছেন। বাজারটিতে বিজয়নগর উপজেলার মুকুন্দপুরসহ বিভিন্ন এলাকার লিচু ওঠে। পাটনাই ও বোম্বাই জাতের লিচু পাওয়া যায় এখানে। বর্তমানে বোম্বাই জাতের লিচু উঠছে বেশি। ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ মৌলভীবাজার, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী থেকে পাইকাররা এসে লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বিজয়নগরের চাষিসহ ব্যাপারীরা বাজারটিতে এসে লিচু বিক্রি করেন। লিচুর মৌসুমে অন্তত সপ্তাহ তিনেক বাজার বসে।

লিচু ব্যাপারী মো. কামাল ভূঁইয়া বলেন, ‘অন্য দিন এ বাজার থেকে কুমিল্লার পাইকারের জন্য ২০-৩০ হাজার লিচু কিনে দিই। আজ (গতকাল) দাম একটু কম হওয়ায় এবং বাজারে বেশি ওঠায় ৫০ হাজার কিনেছি। আরো লিচু কেনার চিন্তা করছি।’

মিনি ট্রাকে লিচু ওঠানোর সময় কথা হয় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার মো. কবির হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২৫ হাজার লিচু কিনেছি।’

হবিগঞ্জ থানার সামনে লিচু বিক্রেতা রাজু বলেন, ‘১৬০০ থেকে ২৮০০ টাকা হাজার দরে লিচু কিনেছি।’

কুমিল্লার কান্দিপাড়ার পাইকার মো. কাউছার বলেন, ‘প্রতিদিন অন্তত ৩০ হাজার লিচু কিনি।’ তাঁরা জানান, কয়েক দিনের তুলনায় গতকাল লিচুর দর কিছুটা কমেছে।

খাটিঙ্গা গ্রামের মো. রহিছ মিয়া, আবুল কাসেম, অলিপুরের আব্দুল মালেক, গিলামোড়ার গাজী মিয়া, শামছু মিয়া ও হরিপুরের শরীফ মিয়া বলেন, ‘এবার পাটনাই জাতের লিচু খরার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লিচুর চামড়া ফেটে যাওয়া, আকার বড় না হওয়ায় এ জাতের লিচুর দাম ছিল খুব কম। বোম্বাই জাতের লিচুর ফলন ভালো হলেও এখন আবার বৃষ্টির কারণে ঝরে পড়ছে।’

অলিপুর গ্রামের মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘বাড়ির তিনটি গাছ থেকে প্রতিবছর ৩০-৩৫ হাজার টাকার লিচু বিক্রি হয়। এবার ১০-১২ হাজারের বেশি দাম পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।’

হরিপুর গ্রামের শরীফ মিয়া বলেন, ‘ভোরে যে আকারের লিচু ১৮০০ টাকা হাজার বিক্রি হয়, সকালে সেগুলোর দাম উঠছে সর্বোচ্চ ১৪০০ টাকা।’

বাজারের একটি গাছতলার কাছে গিয়ে দেখা যায়, দাম কম ওঠায় লিচু অন্য বাজারে নিয়ে বিক্রি করার জন্য চাচার সঙ্গে পরামর্শ করছেন কচুয়ামোড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম। খাটিঙ্গা গ্রামের আরব আলী জানান, তিনিও লিচু নিয়ে বিপাকে। ছোট সাইজের লিচু ৮০০ টাকা হাজার বলছেন পাইকাররা। চানপুর গ্রামের আহম্মদ আলী বলেন, ‘এঅবস্থা চলতে থাকলে ৫০ হাজার টেহা দিয়া কিনা বাগানের লিচু বেইচ্চা কেমনে পুঁজি ওডামু বুজতাছি না।’ খাটিঙ্গা গ্রামের মো. ইয়াছিন বলেন, ‘কয় দিন মাতার (মাথা) মইদ্যে থাকতে থাকতে অই লিচু বেছা অইছে। আর আজকা বইয়া থাইক্কাঅ লিচু বেছা অইতাছে না।’

এ বিষয়ে বিজয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মশকর আলী বলেন, ‘বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণুপুর, পাহাড়পুর, হরষপুর, মুকুন্দপুর, চম্পকনগর, সিঙ্গারবিল, মেরাসানি এলাকায় লিচুর ফলন বেশি হয়। এসব লিচুর বেশির ভাগই আউলিয়া বাজারে বিক্রি হয়। এ উপজেলায় ৩০০ হেক্টরের মতো জায়গায় লিচুর বাগান আছে। এর মধ্যে ১৭০ হেক্টরে লিচুর ফলন হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১১২টির মতো গাছ আছে। ভালো ফলন হলে সাত-আট বছর বয়সী একেকটি গাছ থেকে সাত-আট হাজার লিচু হয়। এবারও ভালো ফলন হয়েছে। তবে খরার কারণে পাটনাই জাতের লিচুতে কিছু সমস্যা হয়েছে। অবশ্য যারা আমাদের দেখানো মতো গাছের পরিচর্যা করেছে, তাদের ফলন ঠিকই ভালো হয়েছে। এখানে বোম্বাই জাতের লিচুর চাষই বেশি। এবার বোম্বাই লিচুর ফলনও অনেক ভালো হয়েছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আজিজুল হক বলেন, ‘দিন দিন বিজয়নগরে লিচুর আবাদ বাড়ছে। ওই এলাকার লিচু বিখ্যাত। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও কৃষি বিভাগের নজরদারি বাড়লে আবাদ আরো বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।’

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান

০৯ মার্চ ২০১৭ | 8114 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০