শিরোনাম

প্রচ্ছদ খোলা কলাম, শিরোনাম, স্লাইডার

নদী আর আমি

| বুধবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | পড়া হয়েছে 610 বার

নদী আর আমি

নদীও ক্ষণে ক্ষণে প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে নানান সাঝে সাঝিয়ে তুলে নিজেকে। আমার জন্মভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মফস্বল শহর নবীনগরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বুড়ি নদী। আমি সেই ছোটবেলা থেকে বুড়ি নদীর নানান রূপ বৈচিত্র দেখছি আর মুগ্ধ হচ্ছি। রবীন্দ্রনাথের আমাদের ছোট নদী কবিতাটিতে যে নদীর কথা বর্ননা করা হয়েছে তা যেন প্রায় আমাদের বুড়ি নদীর সাথে মিলে যায়। আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে। পার হয়ে যায় গরু…..। বৈশাখ মাসে এই বুড়ি নদীর কিছু অংশ শুকিয়ে যায় তাতে করে অনায়াসেই মানুষ ও গরু পারাপার হতে পারে। মাছ শিকারিরা মাছ ধরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পরে।

আবার ভরা বর্ষায় নদীর দুইকোল প্লাবিত হয়ে একে বেঁকে সর্পিলাকারের বয়ে চলা এই নদীটি তখন সাগরের রূপ ধারণ করে। নবীনগরের পূর্বদিকের কনিকাড়া গ্রামের উপর দিয়ে দিয়ে নবীনগর টু  শিবপুর রাস্তাটি নির্মাণের ফলে সাগরের সেই রূপ কিছুটা বিবর্ণ হয়েছে। তাই এখন আর আগের মত প্রমত্ত উত্তাল ঢেউ এসে নবীনগর ও মাঝিকাড়ার নদীর তীরবর্তী মানুষজনকে অস্থির করে তুলে না। ছোট বেলায় বর্ষাকালে (আশির দশকের দিকে) মাঝিকাড়া ব্রিজের পাশ দিয়ে হেটে যাবার সময় প্রায় নদীর ঢেউ ও বাতাসের ধাক্কায় নিজেকে সামলিয়ে চলতে হিমশিম খেতে হত। নদীর বড় বড় ঢেউ রাস্তার পাশে আছড়ে পরত, আর ঢেউ এর পানি রাস্তা দিয়ে চলাচলকারি মানুষকে ভিজিয়ে দিয়ে অনেক মজা পেত।


এখন অবশ্য সেই বুড়ি নদীর তীরবর্তী হাওরে বসতি ঘরে উঠেছে এবং রাস্তাঘাট হওয়ায় নদীর সেই রূপ শুধুই স্মৃতি। বর্ষার শুরুতে যখন নদীতে নতুন জোয়ারের পানি আসত দল বেঁধে নদীতে গোসল করার জন্য চলে যেতাম। হায়রে কি মজার গোসল! কত প্রকার স্টাইলে নদীতে ঝাপ দেওয়ার যায় তার কোন হিসেব নেই। দুই চোখ যতক্ষণনা পর্যন্ত লাল বর্ণ ধারণ করতে ততক্ষণ চলত পানির সাথে লাফা-লাফি আর সাঁতার। এখন অবশ্য আমাদের গ্রামের নদীর পাড়ের এক ইঞ্চি জায়গাও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নেই। দুএকটি পয়েন্টে ছোটখাট ঘাট থাকলেও সেগুলো বাণিজ্যিক প্রয়োজনে এমনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সেখান দিয়ে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ সে দিকে পা বাড়ায় না। তাছাড়া নবীনগরস্ত নদীর তীরের অধিকাংশই ময়লা আবর্জনার স্তুপ।

গত বছর তিনেক ধরে কোরবানির ঈদে বাড়িতে গিয়ে সেই বুড়ি নদীতে গোসল করতে যায়। উদ্দেশ্য স্কুল পড়ুয়া ছেলেকে সাঁতার কাটা শিখানো এবং নদীর সাথে তার মিতালী তৈরী করা। আলীয়াবাদ বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে এখন একটু উন্মুক্ত যায়গা আছে যেখানে এলাকার মানুষ গোসল করে। সারা দেশের ন্যায় আমাদের এলাকাতেও বালু বাণিজ্য বেশ রমরমা। ঐ জায়গাটি বালু বাণিজ্যের একটি পয়েন্ট। নদীর তীরে স্তুপাকৃতি বালু রাখার ফলে বুড়ি নদীর এই ক্ষুদ্র অংশটি কিছুটা সমুদ্র তীরের মতই উপভোগ্য। এবারও ঈদের ছুটিতে প্রায় ১০দিন বুড়ি নদীর পানিতে সাঁতার কাটার সুযোগ হয়েছে। ছেলের আবদারে বাড়ি যাবার সময় সাঁতার কাটার টিউব কিনে দিতে হয়েছে। নতুন সাঁতারের টিউব আর নদীর মনমোগ্ধকর পানি, মৃধু বাতাসের ছোট ছোট ঢেউ, মাঝে মধ্যে স্পিট বোর্ডের বড় বড় ঢেউ এবার গোসলের আনন্দকে বাড়িয়ে তুলেছিল বেশ।

আমাদের গোসলের সময় ছিল মধ্যদুপুরে। শ্রাবণের শেষ আর ভাদ্রের শুরুর সময়টা এবারকার কোরবানির ঈদের ছুটি। প্রথম দুইদিন প্রচণ্ড রোধের অত্যাচার মাথা পেতে নিয়েই গোসল করেছি। পানির উপরের ২-৩ ইঞ্চি গরম পানি এক দেড় ফুট নিচে শরীর জোড়ানো শীতল পানি। তারপর ছিল দুইদিন লাগাতার বৃষ্টি। বৃষ্টিতেও গোসল বেশ আরামদায়কই হলো। গোসল করে ভেজা কাপড় নিয়ে বাসায় গিয়ে কাপড় বদলাতে হয়েছে। শেষ তিন চারটি দিন রোধ আর আকাশে মেঘের ছায়ায় গোসলটা জমেছিল বেশ। এর মধ্যে আমার ছেলের ভাতিজা, ফোফাতো, চাচাতো, খালাতো ভাইভেরাদার নিয়ে আমাদের স্ইুমিং ক্লাবের সদস্য হয়েছিল ছয়জন।

প্রথমে পরম দয়াময় সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ এত প্রাচুর্য দিয়ে তিনি পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন। বুড়ি নদীর কাছে আমরা ঋণি তার প্রসস্থ বুকে পরম শান্তিতে কয়েকটা দিন নিজের শরিরটাকে শীতল করতে পেরেছি বলে। জেলেরা মাছ ধরছে, মাঝি নৌকা দিয়ে মানুষ পারাপার করছে, মালামাল আনা নেওয়া করছে, স্পিট বোর্ড এদিক ওদিক ছোটা ছোটি করছে, লঞ্চ চলছে, কতইনা বিচিত্র এই নদীর জীবন। শেষ দিন গোসলের সময় বড় বড় দুইটি বালু বোঝাই নৌকা যাচ্ছিল হঠাৎ একটি নৌকা ভুল পথে চলতে গিয়ে বডগহরের বিলে আটকে গেল অন্য নৌকাটি তখন দির গতিতে এগুতে থাকলো কনিকাড়ার দিকে। নদীতে কত নারী/পুরুষ, ছেলে/বুড়ো, এসে একা একা দীর্ঘক্ষণ গোসল করছে। এই দৃশ্য দেখে লালন ফকিরের একটি জনপ্রিয় গান – জাত গেল জাত গেল – গানের কিছু কথা মনে পড়ত … ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল চামার-মুচি / একই জলে সব হয় শুচি / দেখে শুনে হয় না রুচি / যমে তো কাউকে ছাড়বে না। অসাধারণ !

এই নদীর নাম কেন বুড়ি রাখা হয়েছে? তার একটি মজার গল্প আছে। এক সময় এ নদীর বুক চিরে পণ্যবাহী অনেক নৌকা যাতায়াত করত। জনশ্রুতি আছে যে, পুর্ণিমার রাতে এই নদীতে পালতোলা এক নৌকার মাঝি টলটলে রূপালি নদীর পানিতে চাঁদের বুড়ির ছবি দেখতে পায় এবং পরদিন অনেক চড়া দামে তাদের নৌকায় বহনকারী মালামাল হাটে বিক্রি হয়েছিল। এই নদীর পানিতে চাদের বুড়ির ছবি দেখতে পাওয়ার কারনেই তাদের ভাগ্য এত সুপ্রসন্ন হয়েছে বলেই এই নদীর নাম হয়ে যায় বুড়ি নদী।

এই নদীর বুক দিয়ে যাবারকালে পানিতে চাদের বুড়ির দর্শনে নৌকার মাঝির ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন করেছিল। আমরাও এই নদীর পানিতে গোসল করি, সন্ধ্যার পর নদীর তীরে বসে প্রিয় মানুষের সাথে কত সুখ-দুঃখের গল্প করি, এইত কিছুদিন আগে গভীর রাত পর্যন্ত রূপালি চাদের চিক চিক করা পানির ঢেউ মুগ্ধ নয়নে দেখেছি প্রিয় মানুষের সাথে। এই বুড়ি নদীর বুক চিড়ে নৌকা, লঞ্চ, স্পিটবোর্ডে চড়ে এ শহর ও শহরে ছোটাছোটি করি। ঐ জনশ্রুতির সুত্র ধরে আমরাও আশায় থাকতে পারি আমাদের ভাগ্যও পরিবর্তনের একটা সুযোগ আছে বৈ কি!

আমরা সর্বশেষ বুড়ি নদীর যে যায়গায় গোসল করেছি ঐ জায়গা থেকে প্রায় তিন/চারশত ফুট দূরের কবরস্থানেই আমার পরম আপনজন দাদা-দাদী, আব্বা-আম্মা, ছোট ভাই, ভগ্নিপতি, ভাগ্নি (যাকে আদর করে আমরা বুড়ি বলে ডাকতাম) কত প্রিয় মানুষকে নিজের হাতে মাটি দিয়েছি, তারা চিরনিন্দ্রায় শুয়ে আছে। জানিনা তাদের নিন্দ্রা বুড়ি নদীর অতল পানির মত শীতল কিনা তবে প্রার্থনা করি সর্বদা পরম দয়াময় স্রষ্টাজেন তাদেরকে এই বুড়ি নদীর মত শীতল শান্তিতে রাখেন। আজ কেন যেন মনে হচ্ছে এই নদী, পানি, মাটি, বাতাস, মেঘ-বৃষ্টি, চন্দ্র-সূর্যের আলো এসবের সমন্বয়েইতো আজকের আমি! আবার এসবের মাঝেই একদিন বিলিন হয়ে যাব। তারপর…

Facebook Comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 4704 বার

নবীনগরের এপ্রিল ট্রাজেডি ১৯৭১

২৯ এপ্রিল ২০১৭ | 2738 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮