শিরোনাম

প্রচ্ছদ নবীনগরের খবর, শিরোনাম, স্লাইডার

নবীনগরের কৃষ্ণনগরে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা দাঙ্গাহাঙ্গামার অবসান হবে কবে!

এস এ রুবেল | সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২০ | পড়া হয়েছে 1045 বার

নবীনগরের কৃষ্ণনগরে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা দাঙ্গাহাঙ্গামার অবসান হবে কবে!

তিন যুগের বেশি সময় ধরে চলে আসা গ্রাম্য সহিংসতায় কয়েকজনের প্রাণহানি সহ দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে কয়েক গ্রামের কয়েকশো নারী পুরুষের অঙ্গহানি সহ আর্থীক ক্ষয়ক্ষতির পরিমানও বিশাল। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর অনেকেই আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। এমনকি এসব সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা মোকাদ্দমাতে হাজতবাস খেটেও বোধদয় হয়নি নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের কয়েকগ্রামের বাসিন্দাদের।

বিভিন্ন অজুহাতে তারা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। শত শত জনতার মারমুখী ভঙ্গিতে রক্ত খেলা তাদের কাছে যেন সহজ বিষয় এখন। উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের থানাকান্দি, সাতঘরহাটি, গাজীরহাটি ও গৌরনগর গ্রামের মানুষজন এখন বর্বর জাতি হিসেবে পরিচিত পাচ্ছে সর্বত্র। গতকাল ১২ এপ্রিল দুপুরে দুই পক্ষের সংঘর্ষ শুরু হলে এতে তাদের হিংস্রতার কারনে দেশব্যাপী এখন নবীনগরকে চিনছে অন্যভাবে। যেখানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়াবহতায় স্তম্ভিত সারাবিশ্ব। বাংলাদেশেও এ সংক্রমণ দিনেদিনে বৃদ্ধি পাওয়ায় সারাদেশে আতংক বিরাজ করছে। সরকারের নির্দেশে সবাইকে হোম কোয়ারান্টাইনে থাকা সহ চলতি পরিস্থিতি ভয়াবহতা রোধে বিভিন্ন স্থানে লকডাউন ঘোষনা করেছে সরকার সংশ্লীষ্ঠরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকেও লকডাউন ঘোষনা করা হয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য দেশের এ দুর্যোগকালে শুধুমাত্র গ্রামের আধিপত্যের জন্য লকডাউন নির্দেশ অমান্য করে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের থানাকান্দি গ্রামে দুইপক্ষের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে কয়েকঘন্টা মারমুখী অবস্থানে কয়েকটি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে লুটপাট করে তারা। সংঘর্ষে এক ব্যক্তির পা কেটে তা নিয়ে উল্লাশে ফেটে পড়ে এক পক্ষের লোকজন। এ সময় ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিতে দেখা যায়। বিভৎস এ ঘটনায় গতকাল সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্ঠি হয়। কাটা পায়ের ছবি ও উল্লাসে ফেটে পড়ার ভিডিও ক্লিপ ভাইরালে রুপ নেয়।


প্রায় তিন যুগের বেশী সময় ধরে দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির ইন্ধনে আবু মেম্বার ও মোসলেম মেম্বারের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। এলাকার যে কোন ইস্যুতে ওই দুই গ্রুপের লোকজন সংঘর্ষে মেতে উঠে।
বর্তমানে ওই দুই ব্যক্তির স্থলে স্থানীয় চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান ও কাউছার মোল্লা নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। এ ক’বছরে নানা ইস্যুতে সংঘঠিত সংঘর্ষে ৪টি খুন ও ২৫টি পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে নবীনগর থানায়।

দাঙ্গাপ্রবন এলাকা হিসেবে নবীনগরের একটা আলাদা পরিচিতি রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গ্রাম্য নীতিনির্ধারকদের মন্ত্রপাঠে গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলোকে রক্তের হুলি খেলায় মাঠে নামিয়ে দেন গুটিবাজ ব্যক্তিরা। তাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে বহু পরিবারের মাঝে নেমে আসে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
এতোকিছুর পরেও দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষে নবীনগর থানা কম্পাউন্ডে উভয়পক্ষের সাহেবসর্দারদের উপস্থিতিতে সভা ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়। কাউছার মোল্লা ও জিল্লুর রহমান চেয়ারম্যানকে অতিতের বিষয়ে ছাড় দিয়ে সামনের দিনগুলোতে সমাজ সংস্কারে নিজেদেরকে বিলিয়ে দেবার পরামর্শ দেন। তৎকালীন ওসি আসলাম শিকদার ও ইন্সপেক্টর তদন্ত নাজির আহমদ ও সংশ্লিষ্ট থানার উপপরিদর্শক এস আই স্বপন দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বিরোদের অবসান ঘটাতে ভুমিকা রাখেন।

কথায় আছে ‘যে লাউ সে কদু’ চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী। থানায় পুর্ব বিরোধের মিমাংসা করা হয়েছে ঠিকই। যে যার বাড়িতে গিয়ে আগের গীত গাইতে থাকে। বিষয়টি স্পষ্ট করে খোলাশা করি, গত বছরের ৩১মার্চ অনুষ্ঠেয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবার এক নতুন মাত্রা যোগ হয় এদের মাঝে। উক্ত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধী দুই প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেয় গ্রামের আধিপত্যে বিস্তারকারী দুটি গ্রুপ। বর্তমান ওই দুই গ্রুপের আবু মেম্বার গ্রুপে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এলাকার বর্তমান চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান তিনি আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান মনির (দোয়াত কলম) পক্ষে অপরদিকে মোসলেম মেম্বার গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কাউছার মোল্লা,তিনি আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী কাজী জহির উদ্দিন সিদ্দিক টিটু(নৌকা) পক্ষে নির্বাচন করেন।
নির্বাচনের দিন ভোটারা ভোট দিতে উত্তর লক্ষীপুর সর:প্রা: বিদ্যালয় কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নৌকার সমর্থক কাউছার মোল্লার লোকজনদের সাথে আবু মেম্বার লোকজনের কথা কাটাকাটি হলে এরই রেশ ধরে দুপক্ষের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে প্রায় দেড় শতাধিক ঘর-বাড়িতে তান্ডব চালানোর পাশাপাশি ১৫ জন আহত হয়। নির্বাচনোত্তর এ সংঘর্ষে কাউছার মোল্লাসহ জড়িত উভয় পক্ষের ২০জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। দীর্ঘদিন হাজতবাস কাটিয়ে জামিনে বেরিয়ে আসে কাউসার মোল্লা। এলাকায় অবস্থান নিলে আবারো দুইপক্ষের লোকজন নড়েচড়ে বসে। যে কোন মহুর্তে দা, কিরিচ, ছুড়ি,এককাইট্টা সহ দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র হাতের নাগালেই রাখে। ইংগিত পেলেই ঝাপিয়ে পড়তে পারে।

গৌরনগরে জোরা খুন
২০১৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর গৌরনগর গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ বাধলে এতে কাউসার মোল্লার সমর্থক জয়নাল আবেদিন ও তার চাচাতো ভাই দুলাল মিয়া প্রতিপক্ষের লোকজনের হাতে নিহত হন।

এ বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবাদুল করিম বুলবুল উভয়পক্ষের মাঝে পুর্বের বিরোধ মীমাংসার সিদ্ধান্ত নেন। অবশেষে গত বছরের ২৩ আগষ্ট থানাকান্দি বাজারে আশপাশের কয়েকগ্রামের মানুষজনের উপস্থিতিতে নবীনগর থানা পুলিশ প্রশাষনের সার্বিক তত্বাবধানে স্থানীয় সাংসদ এবাদুল করিম বুলবুল এমপি শান্তির বার্তা নিয়ে দাঙ্গাপ্রবন এলাকায় সভা করেন। হিংস্র মনোভাব ও বর্বরতা পরিহার করে সেখানকার মানুষজনের মাঝে শান্তির দুত হয়ে সভ্যতা গড়ে তুলতে পরামর্শ দেন তিনি। সভায় উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনির, নবীনগর থানা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেহেদি হাসান (বর্তমানে বদলি),ওসি রণোজিত রায় সহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ সহ আওয়ামিলীগ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান ঘটিয়ে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করেন।

এইতো গেলো গত বছরের ঘটনাবলি। এবার চলতি বছরের চারমাসের মধ্যে ওই দুই গ্রুপ দফায় দফায় তিনবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে।

চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারী রাতে বাইশমৌজা গরুর বাজারের আধিপত্য নিয়ে হাজিরহাটি গ্রামে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। প্রথমে চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান গ্রুপের আবু মেম্বারের লোকজন ওই গ্রুপের বিভিন্ন বাড়িতে হামলা চালালে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। এতে উভয় পক্ষের ৩০টি ঘর ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২৮ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে। এসময় তিন পুলিশ সহ ১০ জন আহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে ১৯জনকে আটক করা হয়।
এই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে উভয়পক্ষের ১৯জন নামীয় ও অজ্ঞাত ২০০ জনকে আসামি করে নবীনগর থানায় মামলা রুজু করে। পূলিশ আটক ১৯ জনকে পরেরদিন সকালে জেলা আদালতে সোপর্দ করে।
এ ঘটনায় এলাকার সর্দার কাউছার মোল্লা ও চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমানের বক্তব্যে গ্রামের পরিবেশ শান্ত রাখা সহ সহিংসতা রোধে তেমন কোন ইংগিত পাওয়া যায়নি।
তবে উপজেলার প্রবীন কয়েকজন রাজনীতিবীদ এ বিষয়ে জানান, তারা আধিপত্য বিস্তার করতে এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করে রাখতে চায়।
পুলিশ সেসময়কার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে ২৮ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে এবং ঘটনাস্থল থেকে ১৯জনকে আটক করে।
এ ঘটনার ১ মাস ৭ দিন পর…..
গত ১৭ মার্চ কাউছার মোল্লার সমর্থক (ডিস কামাল নামে পরিচিত) তাকে কুপিয়ে আহত করে চেয়ারম্যানের লোকজন। এদিন জিল্লুর চেয়ারম্যানের দুই ভাইকেও আটকে রাখে ওইপক্ষের তারা। কয়েক ঘন্টা বাদে চেয়ারম্যানের ভাইদের ছেড়ে দেয়া হলে ক্ষোভে দুইদিন পরই (২০ মার্চ) বিকেলে আবারো উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে প্রায় অর্ধশত বাড়িঘর ভাংচুর, ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে ৮ পুলিশ সহ ২৩ জন আহত হয়। এর মধ্যে আশংকাজনক অবস্থায় দেলোয়ার হোসেনকে (২২) ঢাকায় পাঠানো হয়। গ্রেফতার আতংকে গোটা গ্রাম তখন পুরুষ শুন্য ছিলো।

লেখক
এস এ রুবেল
সম্পাদক
নবীনগর টুয়েন্টি ফোর ডটকম

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 25220 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০