শিরোনাম

প্রচ্ছদ নবীনগরের খবর, শিরোনাম, স্লাইডার

নবীনগরের ক্ষুদে বিজ্ঞানী সাব্বিরুল ইসলাম ৩৪তম বিজ্ঞান মেলায় জাতীয় পুরষ্কারে ভূষিত

এস এ রুবেল | মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০১৬ | পড়া হয়েছে 5745 বার

নবীনগরের ক্ষুদে বিজ্ঞানী সাব্বিরুল ইসলাম ৩৪তম বিজ্ঞান মেলায় জাতীয় পুরষ্কারে ভূষিত

নবীনগরের ক্ষুদে বিজ্ঞানী সাব্বিরুল ইসলাম কখনো ভাবেননি ক্ষুদে বৈজ্ঞানিক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে ৩৪তম বিজ্ঞান মেলায় জাতীয় পুরষ্কারে ভূষিত হবেন। তার তৈরি আবিষ্কার নিয়ে সারা দেশে হৈচৈ হবে। বৎসর দু’য়েক আগের কথা, সাব্বিরুল তখন নবীনগর পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম কি দশম শ্রেনীর ছাত্র। পড়ালেখায় বেশ মনোযোগী থাকার কারনে শিক্ষকগণ ও পারিবারের লোকজনের কাছে মধ্যমণি ছিল সে। খেলাধুলায় তেমন আগ্রহ ছিল না সাব্বিরুলের। ছোটবেলা থেকে অবসর কাটত ইলেক্ট্রিক সম্পৃক্ত যন্ত্রপাতি নিয়ে। অগোছালো ভাবনা নিয়ে সারাদিন ঐ সকল উপাদান নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার কারনে বাবা মায়ের বকুনি প্রায়ই তাকে শুনতে হত। স্কুল লেভেলে থাকাকালীন সময়ে ইলেকট্রিক পণ্য, ভাঙ্গাচুড়া এবং নষ্ট জিনিসের উপর জোক থাকায় মাথায় ভাবনা আসে তড়িৎ কি! এবং এটা দেখতে কেমন! তাই মাঝে মাঝে ধরে দেখার স্বাধ থাকায় আগ্রহের অবসান ঘটত বৈদ্যুতিক ইলেক্ট্রিকের শক খেয়ে ছিটকে পরার পর। তখন থেকেই এ বিষয়ের উপর রাগ চলে আসে। তার ভাবনায় যে তড়িৎ আমাকে শত্রু ভেবে দূরে ঠেলে দেয় আমি তার সাথে বন্ধুত্ব করব। মুখে বলা আর কাজ করা সহজ নয়। তারপর এই তড়িৎ নিয়ে শুরু হল সাব্বিরুলের হযররল টাইপের গবেষনার কাজ। একাজ করতে গিয়ে বহুবার সে দুই তারের ঘর্ষনের ফলে পুরো বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন জ্বালিয়ে দিয়েছে । এ নিয়ে মা-বাবার কড়া  শাসনের ভয়ে অনেক সময়  বাড়ি থেকে পালিয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার রছুল্লাবাদ গ্রামের হাজী মো: নুরুল ইসলাম এর ছেলে সাব্বিরুল ইসলাম, তার বাবা রছুল্লাবাদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। চার ভাই বোনের মাঝে সে সবার ছোট। তার মা নাসরীন আক্তার একজন সফল গৃহিণী। বর্তমানে ঢাকার ধানমন্ডিতে বসবাস করছেন।


মুল কথায় আসা যাক, সময় যত গড়ায় তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খায় শৈশবের দোলা দেয়া স্বপ্ন গুলো। সে যখন হাইস্কুলে পা দেয় সে সময় থেকে বিজ্ঞান নিয়ে জানার পরিধি তার বাড়ে। সে জানতে পারে তড়িৎ কি! এতে স্পর্শ লাগলে কেন শক লাগে। এরপর থেকে শুরু হল বিজ্ঞান নিয়ে তার গবেষনার কাজ । সাব্বিরুল চালিয়ে যান অনুসন্ধান। তারপর থেকেই তার বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ ব্যপকভাবে বাড়তে থাকে। ওই কারনে অষ্ঠম শ্রেনীতে পড়াকালীন সময়ে বাসায় নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি করি একটি ছোট খাটো ল্যাবরেটরি। সেখানেই চলে তার গবেষনার কাজ। এক বৎসরের গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে ‘স্টেপ ডাউন ট্রান্সফর্মার’ বানাই সে। যা দিয়ে উচ্চ মাত্রার বিদ্যুতকে যেমন ১২০০-১৬০০০ ভোল্টের বিদ্যুতকে সমভাবে বন্টন করে নিম্ন মাত্রায় নামিয়ে আনা যায় কোনো ধরনের সিস্টেম লস ছাড়াই(০%)। অর্থাৎ বাংলাদেশে এরকম স্টেপ ডাউন ব্যবহার করার ফলে (৪-৬%) বিদ্যুত লস হয়, যা দেশের বিদ্যুতের একটা বিশাল অংশের অপচয় হচ্ছে। তার তৈরি প্রযুক্তির ফলে বিদ্যুত বন্টনে সিস্ট্যাম লসের হাত থেকে বাচবে এ খাতটি।

অবাক করা বিষয় হচ্ছে এটা তৈরিতে খুব বেশি খরচ হয়নি তার। সে জানায় ‘স্টেপ ডাউন ট্রান্সফর্মার’ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে কাঠের আবদ্ধ একটি বাক্স, মাটি, লবণ, তারকাটা।

এরকম একটা প্রজেক্ট বানানোর পর সেটিকে বিজ্ঞান মেলায় প্রদর্শনের জন্য উক্ত প্রজেক্ট নিয়ে হাজির হন জেলার ৬৭ টি স্কুল কলেজের মধ্যে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিযোগীতায়। সেখানে শির্ষে থেকে চ্যাম্পিয়নশীপ অর্জন করার পর পরবর্তি ধাপে চট্রগ্রামে অনুষ্ঠিত জাতীয় বিজ্ঞান মেলায় বাছাই পর্বে ৩৭৮টি স্কুল-কলেজের সাথে সেও অংশ নেয়। সেখানে প্রতিযোগীদের মধ্যে থেকে বাছাইপর্বে টিকে ৩৪তম জাতীয় বিজ্ঞান মেলায় অংশ নেয়ার সুযোগ পায় সাব্বিরুল।তিন দিনের ওই মেলার সমাপনি দিনে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।

fr

অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে কথা সে জানায় ওই সময়ে ভাবিনি শত শত প্রতিযোগীদের মধ্যে টিকে থাকব। একে একে সবার নাম ঘোষনা করা হলে আমিও আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তখন মাত্র বিশেষ পুরষ্কার দেওয়া শেষ হয়েছে । তখনো নিজের নাম শুনতে না পারায় পুরু মাথা ঝিমঝিম করে ঘুরছে, চোখে ঝাপসা দেখতে পাচ্ছি। টের পাচ্ছি মাথার উপরে প্রচন্ড শক্তিতে কেউ যেন চাপ দিয়ে রাখছে। নড়বার শক্তি নেই। একে একে সব বিজয়ী প্রতিযোগীর নাম বলা শেষ। চ্যাম্পিয়নশিপ এর নাম তখনও মাইকে ঘোষণা হয়নি। আমার নাম চ্যাম্পিয়নশিপের তালিকায় থাকবে অতটা আশা করার মত বোকা আমি ছিলাম না। তাই আশা ছেড়ে দিয়েছি………হঠাত মাইকে ঘোষনায় আমার নাম বলা হল। আমি তখন বাকরুদ্ধ ছিলাম, আনন্দে চোখের কোনে জল চলে আসে।
ওই সময় আমাকে জাতীয় ক্ষুদে বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ওই দিন থেকে ৩ দিনের জন্য সরকারীভাবে আমাকে ও বিজয়ীদের চট্রগ্রাম ডিসি কোয়াটার্সে থাকতে দেয়া হয়। পুরস্কার পাবার পর আমাকে ওখানকার জেলা প্রশাসক মহোদয় ব্যক্তিগত ভাবে ফোন দিয়ে অভিনন্দন জানান, এছাড়াও আমার নিজ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) মেডাম ফোন দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সে সময়ে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউএনও সহ স্কুল, হাইস্কুলের শিক্ষকরা ফোন দিয়ে অভিনন্দন জানান।

এর পরে সফলতার সাথে আমি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৩৪তম জাতীয় বিজ্ঞান মেলার প্রদর্শনীতে আমার প্রকল্প প্রদর্শন করি। ‘স্টেপ ডাউন ট্রান্সফর্মার’ প্রদর্শনকালে মেলায় উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞানী ড. আজহারুল ইসলাম, ড. মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী সহ আরও অনেকে। এখান থেকেই আমি জাতীয় পুরস্কারে ভুষিত হয়। আমার এ অর্জনে প্রানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নবীনগর পাইলট হাই স্কুল আমাকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেয়।

‘স্টেপ ডাউন ট্রান্সফর্মার’ জাতীয় বিজ্ঞান মেলায় প্রদর্শন করার কিছুদিন বাধে ড. মোহম্মদ জাফর ইকবাল এ প্রজেক্ট নিয়ে শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার  জন্য সাব্বিরুলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এ বিষয়ের উপর ফোনে অনেকক্ষন কথা বলেন তিনি।

13814439_826119964187639_694875432_nএসএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া সাব্বিরুল ইসলাম ক্ষুদে বিজ্ঞানির স্বীকৃতী পাওয়া ছাড়াও জাতিসংঘের ইউনিসাবের একটি সম্মেলন অংশ নিয়ে ‘ফাদার অফ নেশন সিম্বল এওয়ার্ড’ অর্জন করেন। প্রতিবছর বাংলাদেশে আয়োজন করা হয় বানমুন কনফারেন্স। এটি জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসাবের একটি সম্মেলন। যেখানে জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত সকল দেশের প্রতিনিধিগন উপস্থিত থাকেন। গত মাসের ১৩ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত চলা জাতিসংঘের এই সম্মেলনে আমি সাউথ সুদানের প্রতিনিধিত্ব করি এবং বিভিন্ন সময়ে এতে বক্তব্য রাখি, 13823302_825974660868836_1121704727_nপ্রতিদিন ইংরেজীতে বক্তব্য রাখলেও শেষদিন আমি বাংলায় বক্তব্য রাখি। ওই অনুষ্ঠানে বাংলায় বক্তব্য রাখার জন্য আমাকে ফাদার অফ নেশন সিম্বল এওয়ার্ড দেয়া হয়। সম্মেলনটি আদমজী কলেজে অনুষ্ঠিত হইয়েছিল। এটি ছিল বাংলাদেশ মডেল ইউনাইটেড নেশন (বানমুন) এর ৮তম অধিবেশন। এখানে অনেক দেশের কূটনীতিক বৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এই অধিবেশনের মূল লক্ষ্য ছিল প্রত্যেক দেশের সুবিধা অসুবিধা গুলো সম্পর্কে অধিবেশনে অবগত করা এবং প্রয়োজনীয় কিছু বিষয়ের উপ বিভিন্ন দেশের ভোটের মাধ্যমে পাশ করানো আমি ৪ দিন সফলভাবে সাউথ সুদানের প্রতিনিধিত্ব করি।

উল্লেখ্য, চট্রগ্রাম বিভাগের মধ্যে একমাত্র আমিই ওই অধিবেশনে যোগ দেয়। আর এই অধিবেশনে আমাদেরকে ডিপ্লোম্যাটিক পার্সন হিসাবে দেয়া হয়। এ  স্বীকৃতি পাবার কারনে যেকোনে সময় জাতিসংঘের যেকোন দেশে গমনের সুযোগ থাকছে আমার।

আবিষ্কারের পাশাপাশি সাব্বিরুলের রয়েছে ভ্রমণের শখ। ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশের অনেক পাহাড়ে পর্বতে চড়েছে সে। উল্লেক্ষ্য, কেওক্রাডং, চিম্বুক, তাজিংডং, সাকা হাপং, নাফাকুম  ইত্যাদি ।

নবীনগর থাকাকালীন সময়ে সে ছিল স্কাউটের নবীনগর পাইলট হাই স্কুলের প্যারেড গ্রাউন্ড কমান্ডার। বিভিন্ন সময়ে স্কাউটের বিভিন্ন ক্যাম্পে সে অংশ নেয়।

সাব্বিরুলের চলতি সময়ের ব্যস্ততা কাটছে পড়ালেখা ও রোবটিক্স নিয়ে গবেষণার কাজে। বর্তমানে সে ড্রোন প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা জানালেন। তার তৈরি ড্রোন রিমোট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ না করে এন্ড্রয়েড মোবাইল থেকে এপসের মাধ্যমে স্যাটেলাইট দ্বারা তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এটির গতি থাকবে ৮০ কি.মি.।

তার এ আবিস্কার ঝুকিমুক্ত সংবাদ সংগ্রহে ব্যাপক ভুমিকা রাখবে বলে জানালেন। তাকে এ কাজে বুয়েটের চার সদস্যের সাস্ট রোবটিক টীম সহযোগীতা করছেন।  সে জানায়, আবিষ্কারের নেশা আমার সবসময় ছিল এবং আছে। আমার এইচএসসি পরিক্ষার বেশিদিন বাকি নেই। এ কারনে পড়ার চাপে আছি। উচ্চ শিক্ষায় দেশের বাইরে অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকা যাওয়ার কথা জানালেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে সামরিক বা বেসামরিক পাইলট (ক্যাপ্টেন) হওয়ার গোপন মনোবাসনার কথা জানালেন।

পরিশেষে সাব্বিরুলের আকাশে উড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক এ প্রত্যাশা করি।

লেখক- এস এ রুবেল সম্পাদক, নবীনগর টুয়েন্টি ফোর ডটকম

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 25762 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১