শিরোনাম

প্রচ্ছদ নবীনগরের খবর, শিরোনাম, স্লাইডার

নবীনগরের_বীর_কন্যা_সুনীতি_চৌধুরী

জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন | মঙ্গলবার, ২২ মে ২০১৮ | পড়া হয়েছে 1473 বার

নবীনগরের_বীর_কন্যা_সুনীতি_চৌধুরী

৮৭ বছর আগের কথা, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৩১ সন। মাঘ মাসের জাঁকালো শীতের সকাল, গোমতী নদীর তীর থেকে কনকনে হাওয়া বইছে কুমিল্লা শহরে(তৎকালীন ত্রিপুরা প্রভিন্স)। স্বাভাবিক ভাবেই চলছিল শহরের সমস্ত কাজ। কোথায় কোন হট্টগোল ছিলনা। স্কুলের অনুষ্ঠানের কথা বলে মাত্রই ৮ম শ্রেনীর বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ করা ১৪ বছরের দু’জন কিশোরী বাসা থেকে বের হয়েছিল। কুমিল্লার বিখ্যাত খদ্দরের শাড়ি আর চাদর জড়িয়ে ছদ্মবেশে! দু’জনের শাড়ীর কোটরে গুঁজা ছিল দুটি রিভলবার, পয়েন্ট ফোরটিফাইভ(.৪৫) ও পয়েন্ট টুয়েন্টি টু(.২২) বোরের। পথ থেকে তাদেরকে ঘোড়ার গাড়ীতে তুলে নেওয়ার দায়িত্বে ছিল বিপ্লবী সতীশ রায়ের। ঘোড়ার গাড়ী ছুটে চলছে তৎকালীন কুমিল্লার ম্যাজিষ্ট্রেট স্টেভিন্স’র সাদা দোতলা বাংলো বাড়ীর দিকে।স্টেভিন্সকে গুলি করে হত্যার দায়িত্বটি পড়েছিল – শান্তি ও সুনীতির উপর। হয়ত এটাই শেষ যাত্রা! হৃদয়ে সূর্যকে ধারন করে, হাতের মুটোয় জীবনকে বাজি রেখে ছুটে চলেছেন তাঁরা।
দু’জন কিশোরী!
দু’জন তেজোদীপ্ত বিপ্লবী।

চার্লস জিওফ্রে বাকল্যান্ড স্টিভেন্স।৩৯ বছর বয়স্ক খতরনাক ও দুশ্চরিত্রের অধিকারী এক ম্যাজিষ্ট্রেট- পোস্টিং:কুমিল্লা, ১৯৩১ সাল। যিনি স্থানীয় নারী ও কিশোরীদের ধর্ষন করতেন। এবং এটা তার অধিকার বলে প্রকাশ্যেই ঘোষনা করতেন। কথিত আছে তার দ্বারা ধর্ষণের বলী হয়েছিলেন সুনীতির বান্ধবী তৎকালীন যুগান্তর দলের নারী সদস্য পারুল দেবী।
সুনীতি চৌধুরী। ভারতীয় উপমহাদেশের বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী বিপ্লবী। জন্ম ১৯১৭ সাল, (তৎকালীন ত্রিপুরা প্রদেশের) বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার ইব্রাহীমপুর গ্রামে তার পিতৃভূমি। ৪ ভাই ও দুই বোনের পরিবার। তার দুই ভাইও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। পিতা উমাচরন চৌধুরী বৃটিশ অফিসে চাকরি করতেন, সরকারী চাকুরী করলেও তিনি মেয়ে সুনীতি কে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতেন।
ফিরে আসি ১৯৩১ সালের গোঁড়ার দিকে। শান্তি ও সুনীতি উভয়েই কুমিল্লা ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেনীর ছাত্রী। তাঁরা স্কুলের সাধারন ছাত্রীদের নিয়ে গড়ে তোলেন একটি ছাত্রীসংঘ। সুনীতি ছিলেন সেই স্বেচ্ছাসেবী দলের অধিনায়িকা।
অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সুনীতি কুমিল্লার নেতৃস্থানীয় বিপ্লবীদের নজরে আসেন। সহপাঠিনী প্রফুল্ল নলিনী তাকে নিয়ে গেল যুগান্তর দলে। যুগান্তর দলটি ছিল তৎকালীন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি। অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হলেন সুনীতি। ঘোড়ার গাড়ীতে করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হত ময়নামতি কোটবাড়ীর জঙ্গলে, প্রশিক্ষনের জন্যে। লাঠি চালানো, ছুরা খেলা, ও রিভলবার চালানোসহ চলল সব প্রশিক্ষণ। একই প্রশিক্ষণ নিয়েছিল তার সহপাঠি শান্তি ঘোষও। সুনীতি ছোটখাট বলে তাকে দেওয়া হয়েছিল পয়েন্ট টুয়েন্ট টু বোরের রিভলবার। তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে ট্রিগার টিপলে পারত না বলে মধ্যমা আঙ্গুল ব্যাবহার করত সুনীতি।
কিছুদিনের মধ্যে শান্তি ও সুনীতি বিপ্লবী কাজে পারদর্শীতা অর্জন করেন। বিপ্লবী দলের নেতারা সিদ্ধান্ত নেন যে, শান্তি ও সুনীতি কে দিয়ে লম্পট নরপশু ম্যাজিষ্ট্রেট স্টেভিন্সকে হত্যা করে বৃটিশ রাজত্বে চরম আঘাত আনবেন।
১৯৩১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর সকাল ১০টা, চলে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষন। সাঁতারের ক্লাবের অনুমতি নেওয়ার উছিলায় শান্তি ও সুনীতি প্রবেশ করলেন ম্যাজিষ্ট্রেটের বাংলোয়, ইলা সেন ও মীরা দেবী ছদ্মনামে। ম্যাজিষ্ট্রেট স্টেভিন্স যখন দরখাস্তে চোখ বুলাচ্ছিলেন সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠে দুই বান্ধবীর রিভলবার। প্রথমেই গুলি করেন সুনীতি মাথা বরাবর, তারপর শান্তি ঘোষ। গুলি খেয়ে তৎক্ষনাৎ মাটিতে লুটিয়ে পরে মারা যান স্টেভিন্স। প্রহরীদের হাতে ধরা পড়ে নির্যাতনের শিকার হল দুই বিপ্লবী কিশোরী। তাঁদের সেদিনের সেই গুপ্ত আক্রমণে গতি পেয়েছিল সমগ্র বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে শান্তি ও সুনীতির নাম। এই কিশোরীদের দেখতে কোর্টে শত শত সাধারণ মানুষ আসতেন। শান্তি ও সুনীতির চোখে থাকত বিদ্রোহের দৃষ্টি। ভয় বলে তাঁরা কিছু জানত না। সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে দুজন একসাথে দেশাত্ববোধক গান গাইতেন!
অবাক বিস্ময়!!


বিচারে তাদের কিশোরী বয়সের কথা বিবেচনা করে ফাঁসির বদলে শান্তি ও সুনীতি উভয়েরই যাবজ্জীবন দীপান্তর দন্ডে দন্ডিত হন।
সুনীতির করা প্রথম গুলিতেই মারা যান স্টিভেন্স, এজন্যেই ইংরেজ সরকারের আক্রোশ ছিল তাঁরই উপর সবচেয়ে বেশী। সুনীতির কারাজীবন ছিল দীর্ঘ অত্যাচারের করুণ কাহিনী। মৃত্যুদন্ড থেকে বড় শাস্তি দেওয়ার চেষ্ঠা করা হয় তাঁকে, তৃতীয় শ্রেনীর কয়েদী করে একটি নির্জন কক্ষে রাখা হয়। ১৪ বছরের একটি মেয়ে দিনের পর দিন মাসের পর মাস এক নির্জন প্রকোস্টে কাটিয়েছে। নিদারুণ, নিষ্ঠুর, নির্মম।
১৯৩৭ সালে মুক্তি পান সুনীতি ততদিনে তছনছ হয়ে গেছে তাঁর ব্যাক্তিগত জীবন। ইংরেজ সরকারের অমানুষিক চক্রান্তে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর বাবার পেনশন। বিনা বিচারে জেলে আটক রাখা হয় তাঁর দুই ভাইকে। পুরু পরিবারকে বছরের পর বছর কাটাতে হয় অনাহারে অর্ধহারে। অপুষ্টিতে ভোগে যক্ষা রোগে মারা যান তাঁর ছোট ভাই।
কি অমানবিক!

বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে সুনীতি হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র বৃটিশ গভর্নমেন্টের সামনে মহা ত্রাস, ভীতিকর আইকন। অন্যদিকে পরাধীন জাতীর কাছে মুক্তিদূত- সবার প্রিয় বীর কন্যা।পরবর্তী জীবনে সুনীতি চৌধুরী ডাক্তার হয়ে মানব সেবাই আত্বনিয়োগ করেন।
১৯৮৮ সালের ১২ই জানুয়ারি এ প্রয়াত হন অগ্নিযুগের কন্যা সুনীতি চৌধুরী;
আমাদের ইব্রাহীমপুরের মেয়েটি।
যিনি মাতৃভুমি-মানুষের জন্যে নিজের জীবনকে বাজি রেখেছিলেন মাত্র ১৪ বছর বয়সে!

বিপ্লবী আত্মার মৃত্যু নেই! আজ ২২ শে মে মহান এ ত্যাগীর জন্মদিন। তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা!!

বি:দ্র: বিপ্লবী কিশোরী দু’জনের নামে কুমিল্লা বাদুরতলা থেকে বাগিচাগাও সড়কের নামকরণ করা

ঋনী:
> আবু কামাল খন্দকার- প্রাক্তন সভাপতি, নবীনগর প্রেসক্লাব।
> বিজু চৌধুরী- বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ।
> আশিষ কুমার মুখোপাধ্যায়- ইতিহাসের পাতা থেকে, প্রথম খন্ড।
> শেখ রফিক – শত নারী বিপ্লবী।
> উইকিপিডিয়া।

28685257_1800477386692311_1968800155007400288_n ✒️জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন।

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 25656 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১