শিরোনাম

প্রচ্ছদ খোলা কলাম, নবীনগরের খবর, শিরোনাম, স্লাইডার

নবীনগর’ নামের ইতিকথা

জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন | মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০ | পড়া হয়েছে 296 বার

নবীনগর’ নামের ইতিকথা

মধ্যযুগের ধর্ম বিষয়ক গল্প মঙ্গলকাব্য মতে,প্রাচীন যুগের উত্তাল কালীদহ সায়র (সাগর) এর হাজার বছরের বিবর্তনে জেগে ওঠা বিশাল ভূভাগের একাংশই আজকের নবীনগর। কথিত আছে, চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা বা সওদাগরী জাহাজ এই কালিদহ সায়র দিয়ে সিলেট ও ময়মনসিংহ এলাকায় জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয়ে ব্যস্ত ছিল। বেহুলা লক্ষ্মীণধরের প্রেমকাহিনীও মূলত এই কালীদহ সাগর’কে ঘিরেই রচিত হয়েছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী থেকে পর্যায়ক্রমে গ্রীক, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, সুলতানি ও মোঘল প্রভৃতি রাজবংশ আমাদের এই এলাকায় শাসন কায়েম করে। আবহমান কাল থেকেই ইতিহাসের পাতায় রয়েছে বর্তমান মেঘনা, তিতাস ও বুড়ী বিধৌত নবীনগরের গৌরবময় অবস্থান।


বৌদ্ধ শাসনামলে আমাদের নবীনগর প্রাচীন সমতট রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ইংরেজ আমলের ১৯১০ সালে, শিবপুর ইউনিয়নের বাঘাউরা গ্রামে ভান্ডারির একটি প্রাচীন জলাশয় খননকালে একটি বিষ্ণুমূর্তি আবিস্কৃত হয়। সপ্তম শতাব্দীর এ মূর্তির পাদমূলের লিখা থেকে জানা যায় যে, ‘এই অঞ্চলে সমতট রাজ্যের মহিপাল দেবের রাজত্ব ছিল।’ পরবর্তীতে নাটঘর ও সাতমোড়া গ্রাম থেকে আরো উদ্ধারকৃত সপ্তম শতাব্দীর শিব ও কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি উপরোক্ত দাবীকে জোড়ালো করে।

ইতিহাস খ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ’র বর্ণনায়ও আমাদের জনপদের উল্লেখ্য পাওয়া যায়। সপ্তক শতকের মাঝামাঝি হিউয়েন সাঙ সমতট ভ্রমনে আসেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ডক্টর নীহার রন্জন রায়ের মতে, সমতট নি:সন্দেহে দক্ষিন ও পূর্ব বঙ্গের কিয়দংশ, ত্রিপুরা যার কেন্দ্র। নি:সন্দেহে আজকের নবীনগর বহুকালের ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নবীনগরের নামকরণের ইতিহাস: কবে থেকে নবীনগরের নামকরণ শুরু হয় আত্বভোলা জাতি আমরা সে খবর রাখেনি! নবীনগর নামকরণ নিয়ে মতভেদ থাকলেও, আজ থেকে আড়াই শত বছর আগে ইংরেজ আমলের শুরুতে ১৭৭৬ সালে জেমস রেনেল প্রণীত ম্যাপে নবীনগরের নাম বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। আবিষ্কৃত বহু প্রাচীন এই ম্যাপ এ অঞ্চলের ঐশ্বর্যশালী অতীতের স্বাক্ষ্য দেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে নবীনগর ছাড়াও মানচিত্রটিতে ইব্রাহীমপুর (Ibrampur), বুধাগাছা (Budagassah),সেমন্তঘর(Sementagur) ও গোসাইপুর (Gusipour) গ্রামের নামও উল্লেখ আছে।

ছবিতে জুম করে শুধুমাত্র নবীনগর ও আশেপাশের এলাকাকে দেখানো আছে।

প্রথম ধারার লোকবিশ্বাস মোতাবেক- ‘অতীতে আমাদের এই অঞ্চল নদীগর্ভে বিলীন ছিল। পরবর্তীতে পলি মাটি পড়ে এখানে চর তৈরি হয়। কিছু সংখ্যক লোক এখানে এসে বসতি স্থাপনের জন্যে নতুন ঘর (অর্থাৎ নবীন ঘর) নির্মান করে। এই নবীন ঘরই কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানের নবীনগর নামের উৎপত্তি।’

আরো লােককথা আছে- ‘এই অঞ্চলের সমতট রাজা শ্রী মহিপাল দেবের রাজত্ব ছিল। শ্রী মহিপালের রাজত্বের পরই এই এলাকায় শ্রী নবীনপাল দেব নামে এক পাল বংশীয় শাসকের জনরব রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন- ঐ শাসকের নামনুসারে এ অঞ্চলটি হলো নবীনদেব’র এলাকা, অথবা নবীন এবং গড়ের অপভ্রংশ থেকে নবীনগর।’

আবার বলা হয়ে থাকে যে- মুসলিম বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি’র বাংলা বিজয়ের পর তিনি এ অঞ্চলে সেনাপতি প্রেরণ করেন এবং কোনো এক মুসলিম শাসকের দ্বারা নবীনগরের সৃষ্টি হয়। কিংবদন্তী আছে, হযরত শাহ জালাল (র:) ও তাঁর সফর সঙ্গী ওলী আউলিয়ারা নবীনগর অঞ্চলের ওপর দিয়ে নদী পথে সিলেট যান। যাত্রা বিরতিতে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে কিছুকাল অবস্থান করেন। উপজেলার পূর্বাঞ্চলের বার-আউলিয়া বিল এ জনমতকে জোড়ালো দাবী করে। আবার কেউ কেউ এটাও বলেন- “নবীর নামে এই নবীনগর। ঈদ-ই-মিলাদ্দুনবীর দিনে এ অঞ্চলে নতুন শাসকের উদ্ভবের সুবাদে এ অঞ্চলটির নামকরন হয় নবীনগর”।

সর্বশেষের জনশ্রুতি- ‘বলদাখাল বা বরদাখাত পরগনার জমিদার বেগম রওশন আরার কর্মচারী সীতারাম পোদ্দার জমিদারির এক অংশ ক্রয় করে নবীনগরের গোড়াপত্তন সচেষ্ট হন বিধায় তাঁরই বংশধর নবীন পোদ্দার এর নামকরন হয়েছে বলে মনে করেন।’

আধুনিক নবীনগরের নামকরনে এই এলাকার বিভিন্ন মহলে নানামুখী লোককাহিনী কিংবা লোকবিশ্বাস থাকলেও অকাট্য দলীল দ্বারা কোনটিই প্রমাণিত নহে; তাই ইহা আরোও গবেষনার দাবী রাখে।

(পুনশ্চ: বর্তমান নবীনগর উপজেলার- নবীনগর সদরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১১টি ইউনিয়ন ছিল বরদাখাত/বলদাখাল পরগনাভুক্ত। পূর্বাঞ্চলের ৭টি ইউনিয়ন ছিল নূরনগর পরগনাভুক্ত, এবং উত্তরের ৩টি ইউনিয়ন ছিল সরাইল পরগনাভুক্ত।)

গ্রন্থনা : জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন।
প্রচ্ছদ ছবি-লেখক

তথ্য সূত্র :
রাজমালা- ত্রিপুরার ইতিহাস।
মঙ্গলকাব্য- পদ্মপূরাণ/মনসামঙ্গল।
লোকজ সংস্কৃতি – ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ইতিহাস- মুক্তিযুদ্ধে সাময়িক অভিযান।
নবীনগর উপজেলার পটভূমি- জাতীয় তথ্য বাতায়ন।উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া।
১৭৭৬ সালের বাংলা ও বিহারের ম্যাপ-জেমস রেনেল। মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া।

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 4494 বার

নবীনগরের এপ্রিল ট্রাজেডি ১৯৭১

২৯ এপ্রিল ২০১৭ | 2482 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১