শিরোনাম

প্রচ্ছদ খোলা কলাম, শিরোনাম, স্লাইডার

নাগারচি :- নবীনগরের হারিয়ে যাওয়া এক বিশেষ গোষ্ঠী

জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন | সোমবার, ০৪ মার্চ ২০১৯ | পড়া হয়েছে 1184 বার

নাগারচি :- নবীনগরের হারিয়ে যাওয়া এক বিশেষ গোষ্ঠী

“যার বাইত শাদী হেয় রইছে হুইয়া;
তিনডা নাগারচি বার বাইত ঢুল বাইরায়
উবতি বাবুতি হইয়া”॥

অ…নে…..ক দিন আগে। বৃহত্তর ত্রিপুরা রাজ্য। মহারাজার ভজন ও গুনকীর্ত্তনের জন্যে জমিদাররা নানা বিনোদন গোষ্ঠী তৈরি করল। পাশাপাশি রাজ্য রক্ষার জন্যে চলল যুদ্ধ। তাই সৈনিকদের উৎসাহ দেবার জন্যে প্রয়োজন হলো বাদ্যযন্ত্রীর। আর এভাবেই জন্ম নেয় একটি বিশেষ গোষ্ঠীর, নাগারচি।
নবীনগর ছাড়াও বাংলাদেশের কিছু অঞ্চল ও ভারতের ছত্তিশগড়, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ডে এই নাগারচিরা বসবাস করে। ভারতের নাগারচিরা নিজস্ব নাগারচাল ভাষায় কথা বলে।


নাক্কার্চি। লোকজ ভাষায় নাগারচি। বাদ্যকর, বাজানদার, ঢুলি, আদিম সমাজের ব্যান্ড দল। নবীনগরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ! পরম্পরা !!

নাচগান তাদের পুরুষানুক্রমিক পেশা। এঁরা ব্যান্ডদল নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় চুক্তিতে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। বিশেষ করে সমবেত বাদন। বারো মাসে তের পার্বনে ওরা ব্যস্ত। সুরের ভেলায় শাদীর মেহফিলে, আকীকা, অন্নপ্রাশন, মেয়েদের নাকে-কানে গয়না দিতে আগে নাগারচি ডাক পড়ত। বাজনার সাথে চমৎকার নাচ দেখিয়েও খদ্দেরদের মন আকর্ষন করত।
সেই নাগারচি সমাজের শ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব। পিতা সুপরিচিত নাগারচি সাধু মিয়া। পূর্বপুরুষ দীননাথ শর্মা। উৎসবে অনুষ্ঠানে নবীনগর থানার শিবপুরের খাঁপাড়ার নাগারচি দলটির ঘনঘন ঢাক পড়ত। বেশ নাম ছিল। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ যদি নাগারচি হয়েই জীবন শেষ করতেন তা হলে বলবার কিছু থাকত না। কিন্তু তিনি অন্য ধাতুতে গড়া ছিলেন। তাঁর উচ্চাকাংখা ছিল অতি প্রবল, শুধুমাত্র নিষ্ঠা ও সাধনাবলে বিশ্ব সংগীতের দিকপাল হয়ে উঠেন। এই গল্প আমরা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু জানিনা সেই সমাজের পর্দার পিছনের কথা।

নাগারচি একটি পেশাভিত্তিক সমাজ। ধর্ম পরিবর্তনের পরেও তাঁরা নিজ নিজ পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। আফসোস, সময়ের স্রোতে গুটিয়ে গেছে জীবিকার গ্রাম জোড়া শীতল পাটি। পেশা ও জন্মগত পরিচয়ে ওঁরা হয়েছে দলিত। প্রতিনিয়ত। একটি সম্প্রদায়কে যুগ যুগ ধরে ব্যাঙ্গ বিদ্রুপে জর্জরিত করে রাখা হলে তাদের মানসিকতায় চাপ পড়বেই। আদতে মুসলমান সমাজে তারা অপাংত্তেয়, হিন্দু সমাজের তারা কেউ নয়। নবীনগরের স্থানীয় ভাষায় এঁরা বাজাইন্না। আর বাদ্যকর পাড়া হয়ে উঠে বাজাইন্নাআডি। আসলে বাজাইন্না শব্দটি একটি গালিরুপে ব্যবহ্নত হতে থাকে। চরমভাবে।
ফলত: মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের আশায় তারা আত্মগোপন করে। মুখ লোকায়। বিসর্জন দেয় নাম,আত্মপরিচয়। এভাবেই হারিয়ে যেতে থাকে আমাদের নবীনগরের পেশাভিত্তিক একটি সম্প্রদায়। নাগারচি’র।

বস্তুত নিজেকে অসাধারন এবং অন্যকে ইতর ভাবা একটি মানসিক সমস্যা। কথাটি আমার নয়, সপ্তদশ শতাব্দীর স্পেনিশ লেখক মিগুয়েল ডি কারভেন্তসের।

তাই, বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক আদর্শে মানুষের পরিচয় হবে কেবলই মানুষ। শ্রদ্ধা ও ভালাবাসায় সমৃদ্ধ হোক সবার জীবন।
বেঁচে থাকুক নাগারচিরা, এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে। আমাদের নবীনগরে॥

গ্রন্থনা : জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন।

28685257_1800477386692311_1968800155007400288_nতথ্য ঋণ:
>> স্বদেশ ও সাহিত্য- বোরহান উদ্দিন খান।
>> সঙ্গীত পরিক্রমা- নারায়ন চৌধুরী।
>> সপ্তাহের বাংলাদেশ- বাবু রহমান।
>> বাংলা একাডেমী পত্রিকা- ১৯৮৭।
>> Jashua project India.
>> paricaya – the university of California- 1984
>> তিতাস বিপ্লব- নবীনগর।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 4786 বার

নবীনগরের এপ্রিল ট্রাজেডি ১৯৭১

২৯ এপ্রিল ২০১৭ | 2928 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১