শিরোনাম

প্রচ্ছদ শিরোনাম, সাহিত্য পাতা, স্লাইডার

নার্গিস-নজরুল স্মৃতির উপেক্ষিত জনপদ

জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল | বুধবার, ২৫ মে ২০১৬ | পড়া হয়েছে 1737 বার

নার্গিস-নজরুল স্মৃতির উপেক্ষিত জনপদ

কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রাম আর ‘প্রেমের’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। নজরুল মূলত বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিতি পেলেও এ গ্রামে এসেই জন্ম নেয় তার আরেক কবিরূপ। যার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় অফুরান প্রেম। নজরুলের প্রেমের গান, কবিতা ও চিঠিগুলোর নাড়ি পোতা রয়েছে এ গ্রামে। এখানেই কবির প্রথম প্রেয়সী নার্গিসের সঙ্গে দেখা। তারপর প্রেম ও পরিণয়। এখানে রয়েছে কবির বহু স্মৃতি। কবির সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটার কারণে হয়ত নজরুল সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন নার্গিসকে নিয়ে আর তেমন কেউ আগ্রহ দেখান না। কিন্তু এ নার্গিসই যে কবির বিদ্রোহের আগুনে প্রেমের সুধা ঢেলেছেন তা ভুললে খণ্ডিত নজরুলকে জানা হয়। তাই শনিবার ২৫ মে (১১ জ্যেষ্ঠ) কাজী নজরুল ইসলামের ১১৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সেই স্মৃতি বিজড়িত দৌলতপুর নিয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছেন বাংলামেইলের জেলা প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল। দৌলতপুর খাঁ ও মুন্সি বাড়ি তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের বরদাখাত পরগনার বিখ্যাত জমিদার আগা সাদেকের মেয়ের জামাতা মীর আশ্রাফ আলীর জমিদারী স্টেটের প্রজাহিতৈষী জমিদার রায় বাহাদুর রুপেন্দ্র লোচন মজুমদারের জমিদারী এলাকার অন্তর্ভুক্ত একটি গ্রাম দৌলতপুর। এই গ্রামের দু’টি সম্ভ্রান্ত বাড়ি মুন্সিবাড়ি ও খানবাড়ি। আত্মীয়তার সুবাদে মুন্সিবাড়ি ও খানবাড়ির মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই। খান পরিবার আফগান বংশোদ্ভূত। বংশীয় ও সামাজিক মর্যাদার উচ্চতায় দু’টি বাড়ির অবস্থান কাঁধে কাঁধে মিললেও অথির্ক বিবেচনায় মুন্সিবাড়ির অবস্থান ছিল উপরে। আলী আকবর খান দৌলতপুরের সম্ভ্রান্ত খান পরিবারে খ্রিস্টীয় ১৮৮৯ সালে জন্ম নেন এক সময়ের বহুল আলোচিত আলী আকবর খান। আলতাফ আলী খান, ওয়ারেশ আলী খান, নেজবত আলী খান তাদেরই কনিষ্ঠ ভাই আলী আকবর খান। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া আলী আকবর খান ছিলেন মেধাবী। দারিদ্র্য উপেক্ষা করেই শেষ পর্যন্ত তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ পাস করেন। শিক্ষা জীবন শেষে প্রথমে চাঁদা সাহেবের গৃহ শিক্ষক, পরে সৈনিকের চাকরিতে যোগ দেন। সৈনিক জীবনে এক পর্যায়ে তিনি ক্যাপ্টেন পদমর্যাদায় উন্নীত হন। একজন নাট্যকার (লেখক) হিসেবেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। তার লেখা হিন্দুস্থানের ইতিহাস, মোসলেম চরিত, আদর্শ মহিলা প্রভৃতি গ্রন্থ এবং ভিশতি বাদশাহ ও বাবর প্রভৃতি নাটক উল্লেখযোগ্য। সৈনিক জীবন শেষে রূপসা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। সে থেকে এক পর্যায়ে পুস্তক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হন। বাংলা বাজার ও কলকাতায় ভারতীয়া লাইব্রেরী নামে বইয়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। আলী আকবর-নজরুলের বন্ধুত্ব প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ কমরেড মোজাফ্ফর ও প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সৈনিক শিক্ষানুরাগী ক্যাপ্টেন ডা. নরেন্দ্রনাথ দত্ত এ দু’জন ব্যক্তি ছিলেন আলী আকবর খাঁনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক সময় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথেও তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নজরুল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৭ সালে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে নৌসেনার ট্রেনিং শেষে ১৯১৯ সালের দিকে করাচিতে অবস্থান করছিলেন। সম্ভবত তখনই আলী আকবর খানের সাথে নজরুলের পরিচয় ঘটে। নজরুলের সৈনিক পদমর্যাদা তখন ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার, আলী আকবর ছিলেন ক্যাপ্টেন। নজরুলের দৌলতপুর আসা ১৯২০ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুল দেশে ফেরেন। এক পর্যায়ে মার্চ মাসে বাঙালি পল্টন ভেঙ্গে দেয়ার খবর পান। পরে ১৯২১ সালে (বাংলা ২৩ চৈত্র ১৩২৭) আলী আকবরের সঙ্গে নজরুল কুমিল্লা হয়ে মুরাদনগরের দৌলতপুরে আসেন। তবে, আলী আকবর খাঁনের সঙ্গে নজরুল প্রথম দৌলতপুর এসেছেন কি না তা নিয়ে খান পরিবার ও মুন্সি পরিবারে মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিককালে এ দুই পরিবারের কাছ থেকে পরস্পর বিরোধী বক্তব্যও পাওয়া যায়। মুন্সিবাড়ির বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান মুন্সী ওরফে রওশন মুন্সীর (নার্গিসের ভাতিজা) দাবি, তার চাচা অর্থাৎ নার্গিসের বড় ভাই আব্দুস সোবহান প্রথম মহাযুদ্ধের সৈনিক ছিলেন। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্র ধরেই নজরুলের দৌলতপুরে আসা। তবে, নজরুল কার মাধ্যমে দৌলতপুর এসেছিলেন এসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে হচ্ছে, নজরুল এসেছিলেন এবং আসার কারণেই নজরুল জীবনে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয় এবং নজরুলের সাহিত্য চর্চায়ও যোগহয় নতুন মাত্রা। দৌলতপুরে অবস্থানকালেই একজন বিদ্রোহী নজরুলের মাঝে আবির্ভাব হয় প্রেমিক নজরুলের। নজরুল-নার্গিসের পরিচয় খান বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে মুন্সিবাড়িতে বিয়ে দেন আলী আকবর খাঁনের বোন আসমতের নেসাকে। বাবার বাড়ি একই গ্রামে হওয়ায় আসমতের নেসা প্রায়শই বাবার বাড়ি থাকতেন সেই সঙ্গে তার মেয়ে সৈয়দা খাতুনও। এক পর্যায়ে সৈয়দা খাতুনের বড় ভাই জব্বার মুন্সীর সঙ্গে মামা নেজাবত আলী খানের মেয়ে আম্বিয়া খানমের বিয়ের দিন স্থির হয় ১৯২১ সালের ৫ মে (বাংলা ২২বৈশাখ)। নজরুল তখন দৌলতপুরে। সেই বিয়েতে যোগদেন নজরুল। জনশ্রুতি এবং ঐতিহাসিকদের মতেও ওই দিন ভাইয়ের বিয়েতে আসা ষোড়শী সৈয়দা খাতুনের সঙ্গে যুবক নজরুলের প্রথম দেখা হয়। ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে সখ্যতা। নজরুল ইরানি ফুলের নামে তার নাম রাখেন নার্গিস আসার খানম। নার্গিসের রূপ মাধুরী ও এখানকার প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে দৌলতপুরে টানা ৭১ দিন অবস্থান করেন নজরুল। নজরুল-নার্গিসের প্রেম-বিয়ে দৌলতপুরে একটানা থাকাকালে সৃষ্টি হয় নজরুল-নার্গিসের প্রেমের সম্পর্ক। এক পর্যায়ে আলী আকবর ভাগ্নি নার্গিসকে নজরুলের সঙ্গে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিয়ে দেন। বিয়েতে পার্শ্ববর্তী বাঙ্গরার জমিদার রায় বাহাদুর উপেন্দ্র লোচন মজুমদারসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন বলেও জানা যায়। দৌলতপুরে নজরুলের ৭১ দিন এসময় এলাকার অনেক স্থানই নজরুলের পাদচারণায় ধন্য হয়েছে। পার্শ্ববর্তী প্রাচীন শিক্ষাঙ্গণ বাঙ্গরা ওমালোচন উচ্চ বিদ্যালয়েও গিয়েছেন এবং সেখানে নজরুলকে সংবর্ধনা দেয়ার কথাও শোনা যায়। বাঙ্গরা স্কুলের শিক্ষক আব্দুর রহমান ভুইয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্কুলের সামনে একটি বকুল গাছের নিচে নজরুল বাঁশি বাজাতেন। সেই স্মৃতিবিজড়িত গাছটিও কেটে ফেলা হয়েছে বছর কয়েক আগে। এযাবৎ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নজরুল দৌলতপুরে বসেই ১৬০টি গান এবং ১২০টি কবিতা রচনা করেন। উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলোর মধ্যে- ‘বেদনা-অভিমান’, ‘অবেলা’, ‘অনাদৃতা’, ‘পথিক প্রিয়া’, ‘বিদায় বেলা’ প্রভৃতি। দৌলতপুর অবস্থানকালে সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ দৌলতপুরে এসেছিলেন। নজরুল তাকে কদমবুচি (সালাম) করে সম্মান জানিয়েছিলেন। (তথ্যসূত্র: আলী আকবর খানের ভাই ওয়ারেশ আলী খাঁনের নাতি আব্দুল করিম ও তার ছেলে জুয়েল)। নজরুলের দৌলতপুর ত্যাগ যতদূর জানা যায়, বাংলা ১৩২৮ সালের ৪ আষাঢ় নজরুল অজ্ঞাত কারণে বিয়ের রাতেই দৌলতপুর ছেড়ে গোপনে চলে যান। এ আকস্মিক চলে যাওয়ার পর নজরুল কুমিল্লায় এলেও আর দৌলতপুর আসেননি। চলে যাওয়ার কারণটি এখনো রহস্যাবৃত। এ ব্যার্থ বিয়ের বছর দু’য়েক পর কুমিল্লায় ইন্দ্র কুমার সেন গুপ্তের বিধবা বোন গিরিবালা দেবীর একমাত্র মেয়ে আশালতা সেনকে (প্রমীলা) বিয়ে করেন নজরুল। নজরুল জীবনে নার্গিসের প্রভাব বলা যায়, নার্গিসই একমাত্র নারী যার কল্যাণে পৃথিবীতে নজরুলের মতো একজন বিখ্যাত কবির সৃষ্টি হয়েছিল। একথা নজরুল স্বীকার করে গেছেন ‘হিংসাতুর’ কবিতায়। নার্গিস নজরুলকে কতখানি আলোড়িত করেছিলেন এর স্বাক্ষরও রয়েছে ‘হিংসাতুর’ কবিতা এবং ১৯৩৭ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি নার্গিসকে লেখা নজরুলের একটি চিঠিতে- ‘…আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি- তা দিয়ে তোমায় কোনদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না- আমি ‘ধুমকেতু’র বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না।’ (এটি নার্গিসকে নজরুলের লেখা চিঠি থেকে নেয়া অংশবিশেষ)। অজপাড়া গাঁর যে অচেনা পল্লীবালা কবিকে যুগিয়েছিলেন অগ্নিবীণা বাজানোর পরশমানিক এবং ধুমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হওয়ার যুগান্তকারী শক্তি, তিনি কবিপ্রিয়া নার্গিস। নার্গিসের অপেক্ষা ও দ্বিতীয় বিয়ে নজরুল চলে যাওয়ার পরও নার্গিস তার জন্য ১৬ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। এক পর্যায়ে মামাতো ভাই নোয়াজ্জস আলী টুক্কু খান (তৎকালীন ইউপি ভাইস প্রেসিডেন্ট) কলকাতায় গিয়ে নজরুলের কাছ থেকে এক প্রকার জোরপূর্বকই বিয়ের তালাকনামায় (বিবাহ বিচ্ছেদ) স্বাক্ষর আনেন (১৯৩৭ সালে)। অতঃপর জোর করেই নার্গিসকে বিয়ে দেন ঢাকার হাসানবাদের ছেলেন কবি আজিজুল হাকিমের সঙ্গে। তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে ডা. আজাদ ফিরোজ ইংল্যান্ডের মেনচেস্টারে চিকিৎসক এবং মেয়ে শাহানারা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আলী আকবর ও নার্গিসের জীবনাবসান আলী আকবর খান ১৯৭৭ সালে পরলোকগমন করেন। তাকে সমাহিত করা হয়েছে দৌলতপুরেই। ১৯৮৫ সালে পরলোকগমন করেন নার্গিস। তাকে সমাহিত করা হয় মেনচেস্টার শহরে। আজ নজরুল-নার্গিস-আলী আকবর এদের কেউ নেই। আছে শুধু একটি অমর প্রেমকাহিনী আর কিছু স্মৃতি চিহ্ন। দৌলতপুর (১৯২১-১৯৭১) ১৯২১ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দৌলতপুরের নজরুল অধ্যায়টি অনেকটাই আড়াল ছিল। যতদুর জানা যায়, যে আলী আকবরের হাত ধরে নজরুলের দৌলতপুর আসা আবার এক সময় সেই আলী আকবরই নজরুলের নামটি পর্যন্ত শুনতে পারতেন না এবং তারই হাতে নজরুলের লেখা সংবলিত অনেক কাগজ পত্রাদি ধ্বংস হয়েছে। খান পরিবার আজীবন ‘নজরুল–নার্গিস’ অধ্যায়টিকে একটি কলঙ্কিত ইতিহাস বলে মনে করতেন (যদিও খান বাড়ির বর্তমান প্রজন্ম তেমনটি মনে করেন না)। দৌলতপুরে নজরুল চর্চার গোড়াপত্তন নার্গিসের সন্তানরা দৌলতপুর আসেন না। এদিকে খান বাড়ির অনীহার কারণে অযত্ন-অবহেলায় নজরুলের দৌলতপুর অধ্যায়টি দীর্ঘদিনে অকেটাই আড়াল হয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে দৌলতপুরের আবুল কাশেম বুলবুল ইসলামদের মতো কিছু উৎসাহী ব্যক্তির কল্যাণে লুপ্তপ্রায় ইতিহাস উদঘটিত হয়। স্বাধীনতার পর শুরু হয় দৌলতপুরে নজরুল চর্চা। ১৯৭২ সালের ২৩ জুলাই দৌলতপুর ‘নজরুলের স্মৃতি স্মরণী সংসদ’ গঠিত হয়। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সৈয়দ আমিনুর রহমান ‘নজরুল নিকেতনে’ রূপ দেন। কবিতীর্থ দৌলতপুরের বর্তমান প্রেক্ষাপট নজরুল সব সময় বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। তার লেখাতেই সর্বপ্রথম ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি উঠে এসেছিল। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের কবি, বাংলা ভাষার কবি, আমাদের জাতীয় কবি। সুতরাং তার অবদানের কথাটি মাথায় রেখে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিৎ। কথাগুলো বলেছিলেন কুমিল্লার সাবেক জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুর রহমান। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত বাংলাদেশে বিশেষ স্থানগুলোর অন্যতম কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর যা বর্তমানে কবিতীর্থ দৌলতপুর নামে স্বীকৃত। কবি নজরুল জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এই দৌলতপুরে রচিত হয়েছে। নজরুলের চুরুলিয়া গ্রামে ১৯৫৮ সালেই নজরুল একাডেমী স্থাপিত হলেও সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পর দৌলতপুরে স্থাপিত হয়েছে নজরুল মঞ্চ যা শুধু বছরের বিশেষ কোনো দিবস, বিশেষ কোনো প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করা হয় না। ২০০৪ সালে নার্গিসের ভাইয়ের ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল হক দৌলতপুর মুন্সিবাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নার্গিস-নজরুল বিদ্যা নিকেতন’ নামে একটি বালিকা বিদ্যালয়। স্কুলটিরও এখন দূরবস্থা চলছে। ‘নজরুল স্মৃতি স্মরণী সংসদ’ গঠনের মধ্যদিয়ে দৌলতপুরে স্থানীয় পর্যায়ে নজরুল চর্চা ও স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সাবেক জেলা প্রশাসক সৈয়দ আমিনুর রহমানের প্রচেষ্টায় দৌলতপুর নজরুল অধ্যায়টি জাতীয় পর্যায় আলোচনায় উঠে আসে। সৈয়দ আমীনুর রহমান নজরুল স্মৃতি স্মরণী সংসদকে নজরুল নিকেতনে রূপ দেন। যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল দৌলতপুরে নার্গিসের নামে একটি বালিকা বিদ্যালয়, মহিলা কলেজ স্থাপন, অডিটরিয়াম, উন্মুক্ত মঞ্চ নির্মাণ, সমৃদ্ধ পাঠাগার ও জাদুঘর স্থাপন। পর্যটকদের সুবিধার্থে একটি রেস্ট হাউজ নির্মাণ এবং সংগীত ও নৃত্য নাটক প্রশিক্ষণের জন্য শিল্পকলা একাডেমী স্থাপন প্রভৃতি। দৌলতপুরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কবিতীর্থে রূপদান এবং প্রতিবছর রাষ্ট্রীয়ভাবে তিন দিনব্যাপী নজরুল মেলার প্রচলন শুরু হলেও দৌলতপুরের নজরুল গবেষক বুলবুল ইসলামের মৃত্যুর পর (১৯৯৮ সালে) কবিতীর্থে নজরুল চর্চা অনেকটাই থমকে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য দিলারা হারুন নজরুল স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোতে স্মৃতিফলক লাগিয়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু যথাযথ পরিচর্যার অভাবে এখন সবই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। যে আমগাছের নিচে বসে কবি বাঁশি বাজাতেন সেটি মরে গেছে। বাসরঘরটিও আগের অবস্থায় নেই, স্মৃতিময় খাটটিও ধ্বংসের দিকে। আলী আকবর খান ছিলেন চিরকুমার। তার ভাইয়ের উত্তরসুরীদের ইচ্ছে থাকলেও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে তাদের দ্বারা এ ইতিহাস ঐতিহ্যের যথাযথ সংরক্ষণ করা অসম্ভব। আলী আকবর খাঁনের বংশধর বাবলু আলী খান বলেন, ‘প্রতি বছরই নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বুলি আউড়িয়ে বক্তৃতা দিয়ে যান নেতা এবং সরকারি কর্মর্তারা। কিন্তু বাস্তবতা শূন্য।’ ২০০৭ সালে কুমিল্লা জেলাপরিষদের মাধ্যমে ১ কোটি ২২ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রস্তাবনা প্রেরণ করা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালায়ের তৎকালীণ যুগ্মসচিব ড. কামাল আব্দুল নাছের চৌধূরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল দৌলতপুর পরিদর্শন করেন। এখন সেই উন্নয়ন প্রস্তাবনার কোনো হদিস নেই। নজরুল জাদুঘর স্থাপনের জন্য প্রস্তাবিত ‘আলী আকবর খান মেমোরিয়াল’ ভবনটিও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এটি সংস্কার ও সংরক্ষণ সময়ের দাবি। এদিকে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করা হলে বড়িটি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছ্নে বসবাসকারীরা। এ বাড়িটির বিষয়ে আশু সিদ্বান্ত নেয়া প্রয়োজন বলে সবাই মনে করছেন। জাতীয় নজরুল পদকপ্রাপ্ত শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব গোলাম কিবরিয়া সরকারসহ নজরুল প্রেমীদের দাবি, পূর্ণাঙ্গ নজরুল নিকেতনের বাস্তবায়ন করে স্মৃতিগুলো যথাযথ সংরক্ষণ, একটি নজরুল জাদুঘর স্থাপনের পাশাপাশি নজরুল-নার্গিস বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং মুরাদনগর উপজেলাকে বিভক্ত করে যে নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া চলছে তা যেন নজরুল উপজেলা নামকরণ করা হয়। কবির ১১১তম জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ জোবেদা খাতুন পারুল বলেছিলেন, ‘আমি নজরুল স্মৃতি বিজড়িত দৌলতপুরকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। জাতীয় কবি নজরুলকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও অসম্ভব রকম ভালোবাসতেন। তাই তিনি কবিকে এদেশে নিয়ে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাসেরও ব্যবস্থা করেন।’ দৌলতপুরে নজরুল স্মৃতির দৈন্যদশা দেখে দুঃখ প্রকাশ করেন এমপি পারুল। তিনি নার্গিস-নজরুল বিদ্যা নিকেতনের এমপিওভুক্তি, দৌলতপুরে পূর্ণাঙ্গ নজরুল নিকেতন বাস্তবায়নসহ মুরাদনগরকে বিভক্ত করে প্রস্তাবিত নতুন উপজেলর নামকরণ যেন ‘নজরুল উপজেলা’ করা হয় এ বিষয়ে শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোনার প্রতিশ্রুতি দেন এমপি। কিন্তু তার সেই প্রতিশ্রুতি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। পরিশিষ্ট: সাংবাদিক আব্দুল হাই শিকদার লিখেছিলেন ‘দৌলতপুর শুধু কবি তীর্থই নয়, এ স্থানটি বাংলা সাহিত্যেরও তীর্থ ভূমি।’ ত্রিশাল, দড়িরামপুরসহ কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে নজরুল স্মৃতি সংরক্ষণে জাতীয়ভাবে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ বাংলা সাহিত্যের তীর্থভূমি খ্যাত দৌলতপুরে নজরুল স্মৃতিগুলো আজও কতোটা অবহেলিত উপেক্ষিত তা দৌলতপুরে না গেলে বুঝা যাবে না ।

(কবি নজরুলকে নিয়ে ২০১৩ সালের ২৪ মে আমার লিখা)
নার্গিস-নজরুল স্মৃতির উপেক্ষিত জনপদ। জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল


সুত্র, বাংলামেইল২৪ডটকম

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 25749 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১