শিরোনাম

প্রচ্ছদ খোলা কলাম

নিজামীর ফাঁসি জামায়াতের জন্য অভিশাপ না আশীর্বাদ

অজয় দাশগুপ্ত, কলামিস্ট। | সোমবার, ১৬ মে ২০১৬ | পড়া হয়েছে 863 বার

নিজামীর ফাঁসি জামায়াতের জন্য অভিশাপ না আশীর্বাদ

কেন নিজামীকে নিয়ে লিখব? নিজামী অাবার কে? দেশ মুক্ত না হলে নিজামীরা অামাদের জানে বাঁচতে দিতেন না। একে তো ‘কাফের’, তাতে আবার লিখি বা কথা বলি!

পাকিস্তান কেমন দেশ যারা জানেন না সেদেশের হিন্দু-খ্রিস্টানদের সঙ্গে অালাপ করে দেখতে পারেন। খোদ অারবে যেখানে এরা সহি-সালামতে থাকেন, নিরাপদে জীবন কাটান, পাকিস্তানে তা পারেন না। দেশটির জন্মই হয়েছিল বিদ্বেষ অার সাম্প্রদায়িকতাবশত। এত বছর পরও তাই তাদের বোধোদয় নেই। বরং এখন এটি অারও জঙ্গি, অারও উগ্র ও অন্ধ মানুষের দেশ।


সেদেশের জামায়াত সেদেশের সরকার যখন নিজামীর জন্য কেঁদে বুক ভাসায়, তার শোকে কূটনৈতিক অাচার ও নিয়ম ভুলে বিবৃতি দেয়, তখন কি এটাই প্রমাণ হয় না যে, নিজামী এদেশে রাজনীতি বা মন্ত্রিত্ব করলেও তার সুতোর টান বাঁধা ছিল পাকি খুটায়? রাজনীতিগত কারণে সেদেশের জামায়াত ‘অাহা উহু’ করতে পারে, কিন্তু খোদ সরকার যখন পাতলুন খুলে নেমে পড়ে, তখন এটা অার বলার দরকার পড়ে না যে, নিজামীই দশ ট্রাক অস্ত্রের হোতা। যার টাগেট অার পাকিস্তানের নিশানা এক ও অভিন্ন।

এ লোকটির ফাঁসির পরও কেন তাকে নিয়ে লিখে কলমের কালি বা শব্দের অপমান করব?

বাংলাদেশের যেসব মিডিয়া তার মৃত্যুর অাগে ও পরে খবরের নামে প্রচার-প্রচারণা দিয়েছে ও দিয়ে যাচ্ছে, তাদের মতলব বুঝি। গদির পালাবদলে এদেশে নিজামী-বান্ধব বিএনপি বা অার কেউ এলে যেন নিজেদের ব্যবসা ঠিক থাকে। কারও কারও মনে দেশের অালোকিত মিডিয়ার নামে প্রথম অন্ধকারও কাজ করে। এককালের বাম বা প্রগতিপন্থীরা দোজাহানের নেকির কথাও মনে রাখেন। মুখে-লেবাসে, জীবন উপভোগে মুক্তিযুদ্ধ বা চেতনা– ভিতরে খোয়াব অার সোয়াবের তাগিদ। এরা খাঁটি ঈমানদার নন বলেই নিজামীদের পরোক্ষ তাঁবেদার!

এদেশের বাংলাভাষী মিডিয়ার লজ্জা বা হায়া-শরম থাকলে কভারেজ দেওয়ার অাগে দুবার ভাবত। নিজামীরা একাত্তরে সফল বা বিজয়ী হলে মিডিয়ার ভাষা বাংলা থাকত? মৃত্যুর খবরটিতে হয়তো বলতে হত, ‘‘হামলোগকা দিল টুটকে ইন্তেকাল করেছেন।’’ কথাটা কি অমূলক?

এদের নেতা গোলাম অাজমকে এরা ভাষাসৈনিক বলেন। অথচ রাজনীতিতে ওরা পাকিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলা-উর্দুর মিশেলে এক ককটেল ভাষা বানাতে চেয়েছিল। কলকাতায় যেমন হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে এক জগাখিচুড়ি, অামাদের পরিণতি হত অারও ভয়াবহ। যাদের কথা মানলে মিডিয়া উর্দুর গোলামে পরিণত হয়ে লাটে উঠত তারা যখন নিজামীদের জন্য বাংলায় মায়াকান্না কাঁদেন, লজ্জিত হই।

একুশের চেতনা-বিরোধী নিজামীরা একাত্তরে জয়ী হলে এদেশে গান-বাজনা করতে দিত? পোড়ামাটির নীতি গ্রহণ করা পাকিদের দালালরা বেছে বেছে কাদের হত্যা করেছিল? মতি রাজাকার কমান্ডার হয়ে যাদের মারল তাদের কেউ ভারতের দালাল? না তারা ছিল অাওয়ামী লীগার?

পরাজয়ের ঠিক অাগে কমান্ডার সেদিন যাদের মেরেছিল, মরার অাগে তাদের চ্যালারা অাবারও সেই মেধাবী মানুষদের খুন করে চলেছে। এবার রাষ্ট্র ও সরকার পাশে না থাকায় নামি-দামিদের গায়ে হাত দিতে পারেনি। অথচ পোষাক বদলে যাওয়া বুদ্ধিজীবীরা এখনও তা টের পাননি। পেলেও নানা হিসাবে পদলেহনে ব্যস্ত।

তবু তার কথা বলতে হবে?

যুদ্ধাপরাধ সহজ বিষয় নয়। এ অপরাধ জঘন্যতম। যিনি বা যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের কীভাবে মানবিকতা দিয়ে বিচার করি অামরা? তাছাড়া নিজামীদের স্ববিরোধিতাটা দেখুন। সারাজীবন বিরোধিতা করার পর হালুয়া রুটি ও চেয়ার পাবার পর এরা নীতিকে কাঁচকলা দেখিয়ে ‘সোনার বাংলা অামি তোমায় ভালোবাসির’ সঙ্গে কপালে হাত ঠুকে লাল সবুজকে ভুয়া সালাম জানাতেন। সত্যি যদি নীতিবান হতেন, চান, তারার কওমী নিশান ফিরে না অাসা পর্যন্ত জেহাদ করলেন না কেন? কেন, ওদের ভাষায়, ‘মালাউন’ রবীন্দ্রনাথ অার ‘বিশ্বাসঘাতক’ শেখ মুজিবের গান ও পতাকা মেনে মন্ত্রিত্ব করলেন?

তার মানে, রাজনীতির নীতিহীনতাই ছিল তাদেরও নীতি। সারাজীবন ‘নারী-নেতৃত্ব হারাম’ বলে খালেদা জিয়ার অাঁচলে থাকাটা কীভাবে জায়েজ? অনেকে জানেন, ব্যক্তিজীবনে নিজামী দুহাত জোড় করেও অভিবাদন জানাতেন। ভারতীয়দের প্রতিও তার কোনো রাগ ছিল না। ‘টিভি হারাম ফটো হারামের’ দলের এই নেতা টিভিতে ঠিকমতো কভারেজ না পাওয়ার অভিযোগও তুলেছিলেন জীবদ্দশায়। ফলে কোনটা অাসল কোনটা নকল সেটাও বোঝা দায়।

অামি বৈশাখের শোভাযাত্রায় যাব, নারীদের সঙ্গে ফটো তুলব, কবিতা লিখব, নিজে অাধুনিক পোশাক পরব– ওদিকে বৌকে বা পরিবারকে অাড়ালে রেখে নিজামীদের জন্য কাঁদব– এটার নামই হিপোক্রেসি।

অামি কারও ফাঁসিতে উল্লাসিত নই। তবে মায়াকান্নাও কাঁদি না। এক মহিয়সী নারী যাকে এরা ‘জাহান্নামের ইমাম’ বলে ডাকতেন অাজ তিনি হয়তো তাঁর পুত্র রুমিকে নিয়ে সব দেখছেন। ছেলেকে বলছেন, ‘‘তোর মতো হাজার হাজার শহীদের অাত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। তোদের রক্তে মুক্ত দেশে দড়িতে ঝোলা নিজামীদের দেখে অাজ দেশজননীও অানন্দিত।’’

আরেক সাহসী নারী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা অামাদের নিজামী-কলংক থেকে বাঁচিয়েছেন। বাংলায় কথা বলা, বাংলায় লিখতে জানা, বাংলায় স্বপ্ন দেখা অামরা কী করব তা-ও কি বলে দিতে হবে?

তবে নিজামীর ফাঁসির পর এক ধরনের সমঝোতার পথও খুলে গিয়েছে। সেটা বলার আগে একটা সত্য গল্প বলি। আরও একবার রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও সবাই মিলে বসবাসের পথ খুলে দিয়েছিলেন উদার আকাশ মনের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। দেশ স্বাধীন হবার পর নবজাত দেশে তিনি সবাইকে সুযোগ দিয়েছিলেন দেশকে ভালোবাসার।

সাধারণ মার্জনা বা মাফ করে দেওয়া রাজাকার-দালাল-খুনিদের অনেকেই তখন কারাগারে। তারা ধরে নিয়েছিল, তাদের জীবন তখনই শেষ। এ খবর তাদের কাছে পৌঁছানোর পর তারা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক সভায় মিলিত হয়ে শোকর আদায় করে বঙ্গবন্ধুকে তাদের ‘দ্বিতীয় পিতা’ ঘোষণা করে বলেছিল, ‘‘মা বাবা তাদের জন্ম দিলেও তিনিই তাদের পুনর্জনম দিয়েছেন।’’

এটা যে তাদের মনের কথা ছিল না বা তারা যে আসলে কালসাপ সেটাই আমরা দেখেছি পঁচাত্তরে।বিশ্বাসঘাতকের দল কোনো দিন আমাদের দেশ-মাটি-চেতনাকে ছেড়ে কথা বলেনি। যত দিন এসব যুদ্ধাপরাধী বেঁচে থাকবে তত দিন তারা এদেশের অকল্যাণ চাইবে।

কিন্তু এই কলংক-বোঝা কত দিন টানবে জামায়াতে ইসলামী নামের দলটি? আসলে তাদের সামনে যাবার কাজটা সহজ করে দিয়েছে নিজামীদের ফাঁসি। এ বোঝা নামানো তাদের জন্য সহজ ছিল না। এখন তারা চাইলে পরিশুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের প্রতি অনুগত হবার রাজনীতি করতে পারে। এমনিতেই তাদের নিষিদ্ধ করার দাবি পপুলার হয়ে উঠছে। সঙ্গে আছে পাকিস্তানের মদদ। এদের সঙ্গ ছাড়তে হবে নতুন প্রজন্মের। আন্ডারগ্রাউন্ড বা জঙ্গিবাদের রাজনীতি এখন মানুষ খায় না। মানুষের জীবনে লেগেছে যাপনের নয়, উদযাপনের হাওয়া। খুলে গেছে বিশ্বায়নের নতুন এক দুয়ার।

জামায়াতের যে ভিত বা সমর্থন-বলয় তাদের এটা বুঝতে হবে। নিঃশর্ত মাফ চেয়ে দেশের সুস্থ ধারার রাজনীতিতে ফিরতে না পারলে এ দলের ভবিষ্যৎ নেই। তাছাড়া পরের লেজুড় হবার কী ফল তা তো এবার তারা হাড়ে হাড়েই টের পেয়েছে। বিএনপি গোলাম আযম থেকে নিজামী সব রায় সব শাস্তিতেই ছিল শীতল ও নীরব। এই অকাজের ঐক্যের কী দরকার?

জামায়াতের যে কর্মী ও সমর্থক বাহিনী, তারা এদেশ ছেড়ে পাকিস্তানে যাবে এমন ভাবনা অন্যায়। তবে তারা কী করবে? মূলস্রোতে মিশতে না পারলে গোপনে গিয়ে সশস্ত্র ঝামেলা করে দেশ ও জাতির বারোটা বাজাবে। অথচ যে যাই বলুক, এখন জামায়াতের সামনে বিজেপি হবারও একটা ছোটখাটো সুযোগ হাজির।

অযথা নিজামীর মতো পাকিস্তানপন্থীর জন্য কেঁদে বুক ভাসিয়ে আসলেই কোনো লাভ নেই। সে কাজটা বরং পাকিরাই করতে থাকুক।

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 4634 বার

নবীনগরের এপ্রিল ট্রাজেডি ১৯৭১

২৯ এপ্রিল ২০১৭ | 2669 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১