শিরোনাম

প্রচ্ছদ নবীনগরের খবর, শিরোনাম, স্লাইডার

নিভৃতেই চলে গেলেন একজন দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের

- মোহাম্মদ মাজহারুল হক | বৃহস্পতিবার, ০২ মার্চ ২০১৭ | পড়া হয়েছে 3220 বার

নিভৃতেই চলে গেলেন একজন দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের

আবুল খায়ের পিতা – কালা মিয়া, মাতা – চন্দ্র বানু। ১৯৫১ সালে মাঝিকাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। যৌবন বয়সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যান ভারতে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অস্ত্রচালনা, বিস্ফোরকদ্রব্যের ব্যবহার ও গেরিলাযুদ্ধের কলাকৌশলের উপর দক্ষতার সাথে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

তারপর দেশে সশস্ত্র যুদ্ধে সাহসীকতার সাথে অংশগ্রহণ করে জয় পদক, রন পদক, সমর পদক ও জ্যেষ্ঠতা পদক অর্জন করেন। দেশ স্বাধীন হলে ৪মে ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। সেনাবাহিনী হতে অবসরের পর কয়েকটি বেসারকারী প্রতিষ্ঠানে পার্টটাইম কাজ করেন এবং কয়েকবছর মালয়েশিয়াতেও একটি প্রতিষ্ঠানে কয়েকবছর কাজ করেছেন। সংসারজীবনে ৩কন্যা ও ২ পুত্র সন্তানের জনক। অত্যন্ত নির্ঝঞ্জাট একজন মানুষ ছিলেন।সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর কোন প্রকার রাজনীতির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি। ১৯৯৬সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তেমন গর্ব করতেন না। গত কয়েক বছর যাবৎ সরকার কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রদত্ত ভাতা পেয়ে খুব সচ্ছলভাবে উনার দিন কেটেছে। সারা দিনই মেয়ের ঘরের নাতি-নাতনীদের নিয়ে আনন্দে মেতে থাকতেন। সাথে রাখতেন সবসময় থ্রি ব্রান্ডের একটি রেডিও। তাতে বিবিসি ওয়ার্ল্ড-এর খবর শোনা ছিলা নিত্য দিনের অন্যতম কাজ। যা রপ্ত করেছিলেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন রণাঙ্গন থেকে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি (মারা যাবার দুইদিন আগে) এক মেয়ে পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে। ইদানিং এই সরকারের মুক্তিযোদ্ধাবান্ধব নানান পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকার ও শেখ হাসিনার প্রশংসা করতেন। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে মাইনর স্ট্রোক করার পর একটি হাত একটি পা দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি করানো হলে ডাক্তার জানাল মাথায় মাথায় রক্ত জমাট বেধে আছে অপারেশন করাতে হবে। তখন উপযুক্ত চিকিৎসার জন্য নানান হাসপাতালে খোজ-খবর নেয়ার পর ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হলে সেখানে মাথার অপারেশন করানোর পর সম্পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরে। স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছিল।


গত ফেব্রুয়ারি মাসের ৮তারিখ আবার স্ট্রোক করেন। আবারও হাসপাতালে ভর্তি কিন্তু এবার সুস্থ্য হওয়ার তেমন সম্ভাবনা থাকলনা। হাসপাতাল থেকে বাড়ি আবার বাড়ি থেকে হাসপাতাল। এভাবে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সকাল ৬টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। যথাযোগ্য মর্যাদায় ২২ তারিখ আসর নামাজের পর নবীনগর পাইলট হাইস্কুল প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ পুলিশ নবীনগর থানার একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। মাগরিব নামাজের পর হাইস্কুল মাঠে দাওয়াতুল ইসলাম নামের একটি সংগঠনের সম্মেলনে সমবেত কয়েক হাজার মানুষের অংশগ্রহণে উনার যানাজা সম্পন্ন হয়। আলীয়াবাদ কবরস্থানে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্যাপ্টেন আহমেদ-এর নেতৃত্ব একটি চৌকস টিম প্রথমে সেনাবাহিনীর পক্ষথেকে কফিনে সেনাবাহিনীর লগো খচিত পতাকা দিয়ে ঢেকে তার উপর ফুলের তোরা প্রদান ও সশস্ত্র সালাম প্রদান করে। তারপর কবরে চিরন্দ্রিায় সমাহিত করার পর সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে কবরের উপর লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। জাতীয় পতাকার উপর ফুলের তোড়া ও বিউগলের বাশি বাঁজিয়ে সামরিক কায়দায় শেষ সম্মান জানানো হয়। কবরস্থান ত্যাগের আগে একজন সামরিক অফিসার মোনাজাত পরিচালনার মধ্য দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়েরকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানান।

17022015_1698761513747315_3420708818516362790_n
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তাঁর সহযোদ্ধারা, এলাকার সর্বস্তরের মানুষ এবং যে বাহিনীতে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাজ করেছেন সেই বাহিনীর প্রধানের পক্ষ থেকে শেষ কৃত্যাঅনুষ্ঠানে যে সম্মান জ্ঞাপন করা হয়েছে তার জন্য তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী সেনা বাহিনীর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। অসুস্থ থাকাকালীন সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা করায় সিএমএইচ কর্তৃপক্ষের কাছে চিরকৃতজ্ঞ তার পরিবার। কোন জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধ একবারই হয় এবং সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে যুদ্ধ করে গাজী হয়ে ফিরে এসে স্বসম্মানে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার ভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের সাহেব তেমনই একজন সৌভাগ্যবান মানুষ। মুক্তিযোদ্ধারা সর্বকালে জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান। আল্লাহ যেন তাঁর পরকালের জীবন চির কল্যাণময় ও চির শান্তির ব্যবস্থা করে দেন এই কামনা করছি।
সবশেষে একটি কথা না বললেই নয় – এই ভেজালের দুনিয়ায় (১৯৭১-এ যাঁরা অস্ত্র হাতে সরাসরি পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করছেনে তাঁদরেই সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়) এইরকম একজন পিওর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সময় ও সুযোগ স্থানীয় বিভীন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সমাজের সুশীল বলে খ্যাত ভদ্রজন ও খ্যাতিমান সংবাদকর্মীদের তেমন একটা থাকেনা তাও পর্যবেক্ষণ করলাম। অথচ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তাদের দৌড়-ঝাপ দেখলে ও জ্ঞানগর্ব বয়ান শুনলে খুবই করুনা হয় তাদের এই স্ব-বিরোধী অবস্থানের প্রতি। আবুল খায়ের সাহেব আমার একমাত্র ভগ্নিপতি। একজন মুক্তিযোদ্ধা বড়ভাই হারানো যাতনটা একটু বেশিই পীড়াদায়ক।

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 26252 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১