শিরোনাম

প্রচ্ছদ শিরোনাম, সাহিত্য পাতা, স্লাইডার

নি:সঙ্গ বকের অসম্পূর্ণ চিঠি

মুহাম্মদ মনিরুল হক | সোমবার, ০৮ আগস্ট ২০১৬ | পড়া হয়েছে 1864 বার

নি:সঙ্গ বকের অসম্পূর্ণ চিঠি

আচ্ছা আপনি কখনো বুকফাটা আর্তনাদ, কলিজা ফাটানো চিৎকার এরকম কিছু দেখেছেন? আমি দেখেছি কলিজা থেকে কিভাবে শব্দ বের হয়। ছেলেটা হেটে যাচ্ছিল। সম্ভবত ছেলেটা খালি গায়েই ছিল অথবা পাতলা সেন্টু গেঞ্জি জাতীয় কিছু একটা পরনে ছিল। আমারতো ব্যাপারটা ভেবেই অবাক লাগছে যে পুরোটা ঘটনা আমার স্পষ্ট মনে আছে । মনে হয় যেন চোখ বুঝলেই আমি দৃশ্যটা হুবহু দেখতে পাই। অথচ এটাই মনে করতে পারছি না ছেলেটার পরনে কিছু ছিল কিনা। অথচ ছেলেটা যে মন্থর গতিতে হেটে যাচ্ছিল, তার চলে যাওয়ার শব্দহীনতাও আমি অনুভব করতে পারি। দুই হাত পিছনে দিয়ে ছেলেটা হাটছিল। এক হাত দিয়ে অন্য হাতের কনুই ধরা ছিল। ছেলেটা পিছনে তাকাচ্ছিল না অথচ মনে হচ্ছিল পিছনের কিছু একটা খেয়াল করেই সে এগুচ্ছে। যেন কোন কিছুর তাড়া খেয়ে সে এগিয়ে যাচ্চে। অথচ তার হাটাচলায় কোনরকম অস্থিরতা ছিল না। হঠাৎই ঘটনাটা ঘটল। এমন একটা ঘটনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আমি কেন, ছেলেটাও হয়ত এতটা প্রস্তুত ছিল না। আচমকা পিছন থেকে তার ঠিক কোমড় বরাবর লাথি বসিয়ে দেয়া হল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল লাথি দেওয়ার সাথে সাথে যেন হঠাৎ করে পৃথিবীর সব শব্দ থেমে গেল। আঘাতটা লাগার সাথে সাথে ছেলেটার একটা হাত সাথে সাথে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে চলে এল। ছেলেটা কোনরকম ঘাড় কাত করে পিছন দিকে তাকিয়েছিল। কোমড়ে যে জায়গাটায় আঘাত লেগেছে সেই জায়গাতেই উল্টো একটা ভাজে ছেলেটা বসে পড়েছিল। বসে পড়েছিল বলাটা বোধ হয় ঠিক হচ্ছে না। তাকে বসে পড়তে হয়েছিল। ছেলেটার চোখে হয়ত অনেক কথা ছিল কিন্তু মুখে কোন শব্দ ছিল না। শুধু অস্পষ্টভাবে বলছিল মা, মাগো। মা শব্দটা একবারে বের হয়নি। মনে হচ্ছিল যেন মা শব্দটা দীর্ঘক্ষণ তার মুখে আটকে ছিল। যেন কলিজার মধ্যে চেপে থাকা শব্দটা বের করে আনতে কষ্ট হচ্ছিল তার। প্রথমবার মা বলার পর দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করে “মাগো” বলেছিল। দ্বিতীয় শব্দটার জন্য যেন ছেলেটার সাথে নিজের অজান্তেই আমিও অপেক্ষা করছিলাম। শুধু আমি না। ছেলেটা মা বলার সাথে সাথে যেন আশেপাশের সবকিছু স্তব্দ হয়ে গিয়েছিল। পাশের নিমগাছ থেকে ঝড়া পাতাটাও যেন মাটিকে স্পর্শ করতে অতিরিক্ত সাবধানী হয়ে গিয়েছিল হঠাৎ। অথচ শব্দ হচ্ছিল। লাথি প্রদানকারি উচ্চশব্দেই তৃপ্তগলায় ছেলেটিকে বলছিল- আমার আশা পূর্ণ হয়েছে। তোর কাছে আমার কোন পাওনা নেই আর। এই দুজনের কাউকেই পরে কখনো আর দেখিনি।

আচ্ছা আমার ছেলেটাও কি এভাবে আর্তচিৎকার করেছিল। সেও কি এমন কোন বাক্য শোনেছিল, “তোর কাছে আমার কোন পাওনা নেই আর”। তার ভুবনেও কি নিমপাতা ঝড়ার নির্জনতা নেমেছিল।


তার ভুবন কেমন হয়েছিল আমি জানি না। তবে আমার ছেলের সাথে সম্পর্ক ছেদ করে যেদিন বাসায় ফিরছিলাম সেই দিনিটা আমার কাছে অনেকটা এমন ছিল। পুরো রাস্তায়, পুরো শহরে যেন কোন শব্দ নেই। শুধু রিক্সার বেলের টুং টাং শব্দ কানে আসছিল আমার।

আচ্ছা আমি বারবার আমার ছেলে আমার ছেলে করছি কেন। কতইবা বয়স হয়েছিল তার। আড়াই মাস কি তিন মাস। মায়ের গর্ভে আড়াই তিনমাসে শিশুদের লিঙ্গ নির্ধারিত হয়? আমার সন্তানটাতো মেয়েও হতে পারত। আমার মনে হয় অধিকাংশ মেয়েই নিজের সংসার এবং একটি সন্তান হিসাবে ছেলে সন্তানই কল্পনা করে। কারনটা কি মেয়েদের ছেলে সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত টান নাকি নির্ভরশীলতা। আমার মনে হয় যেসব মেয়েরা পুরুষদের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রবঞ্চণা পায় তাদের মনেই এই আকাঙ্খাটা বেশি থাকে। ঠিক আকাঙ্খা না, একটা গোপন অহংকার।

আপনি কিন্তু আবার ভেবে বসবেন না আমি ছেলেদের কাছ থেকে অনেক প্রবঞ্চণা পেয়েছি। প্রবঞ্চণা, অপমান এগুলো গায়ে মেখে গোমড়া হয়ে বসে থাকার মেয়ে আমি না। কারও জন্য আমার জীবন থেমে থাকে না, কখনো থেমে থাকবে না। আমার জীবনটা আমারই।

বক পাখি দেখেছেন, জলের কাছাকাছি থাকে তবুও জল তাকে স্পর্শ করতে পারে না। আমাকেও কোন সমস্যা স্পর্শ করতে পারে না। বকের শরীরের পানি ঝড়ার মতই আমি আমার সকল দু:খ-বেদনা ঝেড়ে ফেলতে পারি। কোন সমস্যা বা কষ্ট নিয়ে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদেছি এমনটা আমার মনে পড়ে না।

তবে ইদানিং মনে হচ্ছে আমি ডুবে যাচ্ছি। আমি ডুবে যাচ্ছি ঐ শব্দের মাঝে। শব্দহীন নিমপাতারা ভেসে বেড়ায় আমার চোখের সামনে। তবুও আমার চোখ ভিজে উঠে না। কিন্তু চোখের জল ছাড়াও কান্না হয়, জানেন। বুকের ভিতর কি যেন একটা আটকে থাকে, কোনভাবেই সরানো যায় না। কিন্তু আমি এমনটা চাই না। পৃথিবীতে যার আগমনই ঘটে নি তার কথা কেন আমি ভাবব। তার আগমনতো আমার জন্য সুখকর ছিল না। আমরা প্রত্যেকেইতো নিজের জন্য বাচিঁ। আপনার কি মনে হচ্ছে আমি স্বার্থপরের মত কথা বলছি। ভেবে দেখুনতো আমরা প্রত্যেকেই কি পরোক্ষভাবে শুধু নিজের সুখের জন্য বেঁচে থাকি না। আমরা কখনোই স্বীকার করতে চাই না আমরা শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকি। আমিও শুধু আমার জন্য বেঁচে থাকব। আজ আপনাকে আর কিছু লিখব না। আপনি শুধু আমাকে বলে দিন বুকের সব নি:শ্বাস ছেড়ে আমি কিভাবে কাঁদতে পারব। আমি আমার নিজের সুখের জন্য আমার ছেলেটার জন্য কাঁদতে চাই, বুক ভাসিয়ে কাঁদতে চাই। আমার ছেলেটা কোথায় যেন অনেক কষ্টে বুকের গভীর থেকে কান্না ভেজানো গলায় “মাগো” বলে ডাকার চেষ্টা করে। আমিও তার জন্য কেঁদে যাব জনম জনম।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 26223 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০