শিরোনাম

প্রচ্ছদ সাহিত্য পাতা

পাগল বাবার ভালোবাসা …..

| রবিবার, ১২ জুন ২০১৬ | পড়া হয়েছে 4838 বার

পাগল বাবার ভালোবাসা …..

সূর্যটা আজ বড় বেশি উত্তপ্ত । পিচ ঢালা পথটা দিয়ে বাষ্প বের হচ্ছে । সেই পথ দিয়ে খালি পায়ে রক্ত মাখা একজন কে নিয়ে দৌড়াচ্ছে আয়নাল পাগলা । গায়ে জীর্ণ একটা শার্ট আর একটা ছেড়া লুঙ্গি । সেই জীর্ণ শার্টটা রক্তে ভিজে যাচ্ছে । . তার মাথায় খেলা করছে হরেক রকম চিন্তা । তাকে বাঁচাতে হবে, যেভাবে হোক এই ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে । হঠাৎ থমকে দাড়ায় পথে, শরীরটা বড় বেশি ক্লান্ত হয়ে গেছে । তাকে নিয়ে বসে পড়ে রাস্তায় । তাকে কোথায় নিবে কি করতে হবে সে কিছুই বুঝতে পারেনা । তবে এতটুকু জানে তাকে বাঁচাতে হবে । . আয়নাল শেখ ছোট খাটো একটি চাকরি করতেন । এক ছেলে, ছেলের বউ আর এক ফুট ফুটে নাতি ছাড়া সংসারে কেউ নেই । বিয়ের চার বছর পরই রফিক কে ছোট রেখে তার স্ত্রী মারা যায় । ছেলের কথা ভেবে তিনি আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি । অনেক কষ্ট করে ছেলেকে কুলে কাখে করে মানুষ করেছেন । ছেলে রফিক এখন একটা ছোট খাট একটা চাকরি করে । বাপ ছেলের ইনকাম দিয়ে সুখেই চলছিল তাদের সংসার কিন্তু সবার কপালে সুখ বেশি দিন সয় না । . রোজকার মতো অফিস শেষ করে রিকশা দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন আয়নাল শেখ । বাস বন্ধ হরতাল চলছে । দুই একটা সিএনজি আর রিকশা ছাড়া কিছুই নেই । সামনেই একটা মিছিল যাচ্ছিল । একটা সিএনজি দেখে মিছিল থেকে ইট বর্ষণ শুরু হলো সিএনজির উপর । সিএনজিটা যাচ্ছিল তার রিকশার পাশ দিয়েই । হঠাৎ করে বড় একটা ইট এসে পড়লো তার মাথার উপর । তারপর আর তার কিছুই মনে নেই । তিনি জ্ঞান হারালেন । . দুইদিন যাবৎ আয়নাল শেখ সংজ্ঞা হীন হয়ে পরে আছে হাসপাতালে । জ্ঞান ফিরছে না । পকেটে অফিসের আই ডি কার্ড থাকায় তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে । রফিক তার স্ত্রী আর বাচ্চাটা বসে আছে তাকে ঘিরে । আয়নাল শেখ যেন সামান্য নড়াচরা দিয়ে উঠলেন । রফিক গিয়ে ডাক্তার কে খবর দিলেন । . আয়নাল সাহেবের জ্ঞান ফিরেছে, কিন্তু একি তিনি কাউকে চিনতে পারছেন না । তার অতীতের সব স্মৃতি ভুলে গেছেন । পাগলের মত আচরণ করছেন । অবশেষে তার মাথা স্ক্যান করানো হলা । আঘাতের কারণে মস্তিষ্কের এক পাশে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে যার কারণে তিনি তার অতীতের সব স্মৃতি ভুলে গেছেন । . কি আর করা বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসলো রফিক । কিন্তু তার বাবাকে নিয়ে বাধল বড় বিপত্তি । তার বাবা কি সব ছেলে মানুষী করে সবসময় । তাকে একটু ধমক দিয়ে কথা বললেই পাগলামো শুরু হয়ে যায় । তার স্ত্রী একদম সহ্য করে না এই সব । সংসারে অশান্তি লেগেই আছে । এক সময় তার স্ত্রী বলেই বসলো, . – হয় তোমার এই পাগল বাবাকে এখানে রাখবে নয় আমাকে । তোমার পাগল বাবা এখানে থাকলে আমি তোমার সাথে সংসার করবো না । . রফিক মহা দূর ভাবনায় পড়ে যায় । কি করা যায় তার বাবা কে নিয়ে । তার এতো সমর্থ নেই যে মানসিক হাসপাতালে রেখে তাকে চিকিৎসা করাবে সে । . একদিন ভোরে রাফিক আর তার বাবাকে দেখা যায় কমলাপুর স্টেশনে । তারা পাড়ি দেবে অনেকটা পথ । চট্টগ্রাম যাবার টিকেট কাটা হয়েছে । ট্রেন চট্টগ্রাম আসার আগেই তার বাবা কে রফিক বলে । বাবা তুমি একটু বস আমি টয়লেট থেকে আসছি । কিন্তু টয়লেটের কথা বলে থেমে যাওয়া এক স্টেশনে নেমে পড়ে রফিক । তার বাবাকে ট্রেনে ফেলে পালিয়ে আসে রফিক . সেই থেকে আয়নাল শেখ এখন আয়নাল পাগলা । পথে ঘাটে ঘুরে ফিরে কাটে তার দিন । কেউ কিছু দিলে খায়, না দিলে অনাহারে থাকে । . কিভাবে যেন আয়নাল পাগলা ট্রেনে করে আবার ঢাকায় চলে এসেছে । তার ছেলের কথা তার কিছুটা মনে আছে কিন্তু মনে নেই বাড়ির ঠিকানা । . একটা একসিডেন্ট হয়েছে পথ পারাপারের সময় বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে রফিক । বড় সর ভিড় জমে গেছে কিন্তু কাজের কাজ কেউ কিছু করছে না । আয়নাল পাগলা ভিড় দেখে সামনে এগিয়ে আসে । রক্তাক্ত একটা মানুষ পড়ে আছে । তাকে খুব বেশি চেনা চেনা লাগছে । হ্যা তাই তো এটা তো রফিক । স্বৃতি হারানোর পরের ঘটনা তার তো কিছু কিছু মনে আছে এটা সে বুঝতে পারে রফিক তার অপন জন । . রফিকের রক্ত মাখা শরীর দেখে সে আরো পাগল হয়ে যায় । রফিক কে কাঁধে করে দৌড়াতে থাকে । একসময় বসে পড়ে । তার কৃত্তি কলাপ দেখে অবাক নয়নে তার দিকে তাকিয়ে থাকে সবাই । .একসময় এক রিকশাওলার মায়া হয় । তাকে উঠিয়ে নেয় রিকশায় । সোজা চলে যায় হাসপাতালে । ইমার্জেন্সিতে ডোকানোর সময় আয়নাল পাগলা নির্বাক তাকিয়ে রয় রক্ত মাখা শরীরটার দিকে । ছেলেটাকে কেন যেন তার এতো আপন মনে হয় । তার মস্তিষ্কের নিউরোন গুলো উলোট পালোট হতে থাকে । আবছা আবছা স্মৃতি তার মনোষ পটে ভেসে উঠে । স্ত্রী মৃত্যু, ছোট্ট একটা শিশু, দোলনা তে দোল দেওয়া । ছেলেটি আসতে আসতে বেড়ে উঠা, স্কুল, কলেজ, বিয়ে, সব কিছু । আয়নাল শেখ চিৎকার দিয়ে উঠে, দৌড়ে চলে আসে অপারেশন থিয়েটারের সামনে একজন ডাক্তার তাকে থামিয়ে দেয় । – কি করছেন এসব – ডাক্তার ওকে বাঁচান, ও আমার ছেলে ওরা আমাকে না ভালোবাসলেও আমি ওদের ভালোবাসি । ওরা আমাকে ফেলে আসলেও আমি ওদের ফেলে রেখে যেতে পারি না । পাগল হলেও আমি ওদের বাবা ।

Facebook Comments


এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

রতন সাহেবের কোরবানি ও আমাদের শিক্ষা

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 3706 বার

সাহায্য (ছোট গল্প)

০৫ আগস্ট ২০১৭ | 2355 বার

বৃষ্টিপ্রেম (কবিতা)

১২ জুন ২০১৭ | 2273 বার

আমার গ্রামের ইতিকথা

০৯ জুলাই ২০১৬ | 2271 বার

গোধূলির এই পথে

২০ আগস্ট ২০১৬ | 2038 বার

তবুও ফেলে আসা দিনগুলি মনে পরে যায়

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 1884 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮