শিরোনাম

প্রচ্ছদ প্রবাসের পাতা

প্রবাসীর করুণ কাহিনি

মোহাম্মদ এনামুল হক | বৃহস্পতিবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৬ | পড়া হয়েছে 1643 বার

প্রবাসীর করুণ কাহিনি

পড়ন্ত বিকেল, তাপমাত্রা একেবারে কম। ফুরফুরে হালকা বাতাস! ফেব্রুয়ারীর শেষ দিনগুলোতে মরুভূমির আবহাওয়ায় তেমন উত্তাপ থাকেনা। মার্চের পর ধীরে ধীরে রুক্ষ হতে থাকে সূর্য। বাড়তে থাকে তাপমাত্রা। জুন-জুলাইতে শুরু হয় প্রচন্ড গরম। তাপমাত্রা পৌঁছে যায় কখনো কখনো ৫০ ডিগ্রি পর্যন্ত। আমি মোবাইলে কথা বলতে বলতে আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকার নিচে ফুটপাতে হাঁটছিলাম। বাংলা কথা শুনে এক যুবক আমাকে অনুসরণ করছিলো। একহারা শরীর, শ্যামলা গোলগাল চেহারা। গায়ে ক্লীন কোম্পানীর ইউনিফর্ম। আমার বুঝতে অসুবিধে হলো না যে যুককটি একটি ক্লীনার কোম্পানীতে চাকুরি করে। যুকবটি আমার নিকটে এসে নরম কণ্ঠে বললো, ‘ভাই আপানার মোবাইলটি একটু দেবেন? আমার এক বন্ধুকে একটি মিসকল দেবো’। আমি আমার মোবাইলটি তার হাতে দিয়ে বললাম, ‘মিসকল নয়- আপনি কল করে কথা বলুন আপনার বন্ধুর সাথে’। যুবকটি তার বন্ধুর সাথে ৩/৪ মিনিট কথা বলে আমার মোবাইলটি ফেরত দিলো। কথাবার্তা শুনে মনে হলো যুবকটি বেশ শিক্ষিত । যুবকটি সম্পর্কে জানার কৌতুহল জাগলো আমার মনে। দেশের বাড়ি কোন জেলায়, প্রবাসে কতো বছর হয়েছে? এভাবে কথা শুরু করে অনেকক্ষণ কথা বললাম। যুবকটির সাথে কথা বলে তার সম্পর্কে যা জানতে পারলাম তা হলো- যুবকটির নাম সরওয়ার, দেশের বাড়ি ঢাকায় জেলায়। একাদশ শ্রেণিতে পড়াবস্থায় তারা বাবা একটি মারাত্মক দূর্ঘটনায় পড়ে চাকুরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ৩ ভাই ২ বোন, মা-বাবাসহ ৭জনের পরিবার। তাদের সংসারে একমাত্র তার বাবাই উপার্জন করতেন। কিন্তু তার বাবা দূর্ঘটনায় পতিত হওয়ার পর ইনকাম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। সে পরিবারের বড় সন্তান। অন্য ২ ভাই-বোন উচ্চমাধ্যমিকে পড়েশোনা করে। বাকিরা এখনো ছোট। সরওয়ারের বাবা যখন চাকুরি করতো তখন সে একাদশ শ্রেণির ছাত্র। বাবার দূর্ঘটনার পর সে পড়া-লেখা বন্ধ করে সংসারের হাল ধরে। এক মফস্বল শহরে ভাড়ায় সিএনজি চালাতে থাকে। কিছুদিন পর আত্মীয়-স্বজনদের সহযোগিতায় একটি সিএনজির মালিক হলো সে। সিএনজি চালিয়ে মোটামোটি ভালোই যাচ্ছিলো তাদের দিনগুলো। কিন্তু বিধিবাম! ‌একরাতে সন্ত্রাসীরা তাকে মারাত্মকভাবে আহত করে তার সিএনজিটি নিয়ে যায়। দু’দিন পর জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর সে নিজেকে একটি হাসপাতালে আবিস্কার করলো। এই দূর্ঘটনার পর সরওয়ার সম্পূর্ণভাবে বেকার হয়ে পড়ে। পরিবারে নেমে আসে চরম হতাশা! দু’ভাই-বোনের পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এ অবস্থায় এক দূর আত্মীয়ের কাছে জানতে পারে আবুধাবিতে উন্নতমানের একটি হোটেলে কিছু ওয়েটার নেয়া হবে। পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমানভাড়াসহ ৩ লাখ টাকা দিতে হবে আদমবেপারীকে। এ খবর শুনে সরওয়ারের চোখে ভেসে ওঠে বিদেশ নামক এক সোনার হরিণের হাতছানি। সে ভাবে একবার বিদেশ যেতে পারলে তাদের সংসারে আর কোন অভাব থাকবেনা। বাবার জন্য নিয়মিত ওষধ কিনতে পারবে। ভাইবোনের পড়ালেখা চলবে সুন্দরভাবে। মায়ের মুখে হাসি ফুটবে। অবশেষে কয়েকজন নিকটাত্মীয় থেকে কিছু টাকা হাওলাত এবং এক প্রতিবেশি থেকে সুদে টাকা নিয়ে তিন লাখ টাকা যোগাড় করে আদম বেপারীর হাতে তুলে দেয় এবং গুণতে থাকে প্রতিক্ষার প্রহর। এভাবে তিন মাস অতিবাহিত হয়ে যায় ভিসার কোন খবর আসেনা। চারিদিকে অন্ধকার দেখতে পায় সরওয়ার। হু হু করে মাস চলে যায়, বৃদ্ধি হতে থাকে সুদের টাকা। এভাবে আরো কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর হঠাৎ একদিন বিকেলে আদম বেপারী সরওয়ারকে ফোন করে জানায়-তার ভিসা এসেছে এবং এ সপ্তাহের মধ্যে চলে যেতে হবে। একরাতে পরিবারের সবাই থেকে বিদায় নেয় সরওয়ার, একসময় তাকে নিয়ে বিমান আকাশে উড়াল দেয়। উড়তে তাকে তার স্বপ্নগুলোও। আশা-নিরাশার দোলায় দুলতে থাকে তার মন। ফেলে আসা অনেক স্মৃতি তাকে তাড়া করতে থাকে। মধ্যরাতে আবুধাবি এয়ারপোর্টে এক দালাল তাকে রিসিভ করে নিয়ে যায় ১৫/১৬ জনের গিজগিজ করা একটি ছোট্ট রুমে। কয়েকদিন পর সরওয়ার জানতে পারে তাকে কোন নির্দিষ্ট কোম্পানীর ভিসায় আনা হয়নি, ভিজিট ভিসায় আনা হয়েছে এবং কিছুপর যে কোন একটি ক্লীনার কোম্পানিতে তার ভিসা লাগানো হবে। রুমের সবাইকে এভাবেই দেশ থেকে আনা হয়েছে। একথা শুনে সরওয়ার কান্নায় ভেঙে পড়ে। তখন সে দেশে তার দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় তথা দালালকে ফোন করতে থাকে, কিন্তু কোন কিছুই হলোনা। দেড়মাস পর সরওয়ারের ভিসা লাগানো হয় একটি ক্লীনার কোম্পানিতে। তার কাজ রাস্তা পরিস্কার করা। সেই থেকে চলছে ১২ঘন্টা ডিউটি। শীত, গরম, মরুর লু-হাওয়া উপেক্ষা করেই ডিউটি করছে গত পাঁচ বছর ধরে। কয়েকবার দেশে চলে যেতে চেয়েছিলো সরওয়ার। কিন্তু পরিবারের করুণ অবস্থা বিবেচনা করে নিয়তিকে মেনে নেয় সে। প্রথমে সাতশ’ দিরহাম দিয়ে বেতন শুরু হয়ে বর্তমানে নয়শ’ দিরহাম বেতন পাচ্ছে। আর তা দিয়ে অতি কষ্টে তাদের সংসার চলে, বাবার ওষুধের খরচ ও ভাই-বোনদের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যাচ্ছে সরওয়ার। এই পাঁচ বছর সে দেশে যেতে পারেনি। সুদের টাকা শোধ করলেও ঋণের টাকা এখনো কিছু বাকি আছে বললো সে। বুকের ভেতর অনেক দুঃখ জমে আছে সরওয়ারের। জমে আছে অনেক না পাওয়ার ব্যাথা। তবুও সে স্বপ্ন দেখে একদিন তার বাবা ভালো হয়ে যাবে। ভাইবোনরা পড়ালেখা শেষ করে অনেক বড়ো চাকুরি করবে। মায়ের মুখে হাসি ফুটবে, সে বিয়ে করবে, একটি সুন্দর পরিবার হবে, আরো কতো কী! এসব কথা বলার সময় সরওয়ারের চোখের কোণে অশ্রু জমতে থাকে। বেরিয়ে আসে একরাশ হতাশার দীর্ঘশ্বাস। সরওয়ারের সাথে কথা শেষ করে আমি আবুধাবি কর্ণিশে হাঁটছিলাম এবং তার কথা ভাবছিলাম। ততক্ষণে দিনের আলো খানিকটা পান্ডুর হয়ে এসেছে। সন্ধ্যা নামার সাথেসাথে এই তিলোত্তমা নগরীতে শুরু হবে আলোর ঝলকানি। সরওয়ারের জীবনে সে আলোর ঝলকানি কোন প্রভাব ফেলতে পারবে? তার অগণিত স্বপ্ন পূরণ হবে কবে? যে সোনার হরিণ ধরতে সে বিদেশ বিভূঁইয়ে এসেছে সে সোনার হরিণ ধরতে পারবে কী? এভাবে সরওয়ারের মতো অগণিত যুবকের স্বপ্নগুলো মরুঝড়ের কবলে পড়ে বিলীন হয়ে যায়। কারো কারো আশা মরুবালিতে চাপা পড়ে থাকে দিনের পর দিন। তবুও সরওয়াররা স্বপ্ন দেখে, জীবনের স্বপ্ন, ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

 


লেখক- মোহাম্মদ এনামুল হক,আরব আমিরাত থেকে।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মধ্যপ্রাচ্যে মাহে রমজান

১২ জুন ২০১৬ | 2992 বার

দেখে এলাম আরব সাগর

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 2654 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১