শিরোনাম

প্রচ্ছদ নবীনগরের খবর, শিরোনাম, স্লাইডার

বাশারুক গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহের উদ্দিনের সাথে যুদ্ধকালীন সময়ের কথোপকথন

এনামুল হক এনাম | শনিবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৮ | পড়া হয়েছে 766 বার

বাশারুক গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহের উদ্দিনের সাথে যুদ্ধকালীন সময়ের কথোপকথন

দেশের সুর্য সন্তানরা আজ অবহেলিত। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ভীড়ে আজ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অসহায় হয়ে পড়েছে। অনেকটা ক্ষোভ নিয়েই এ কথা জানালেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহের উদ্দিন।
১৯৫৩ সালে নবীনগর উপজেলার লাউর ফতেহপুর ইউনিয়নের বাশারুক গ্রামে জন্মগ্রহন করেন তিনি। পিতা মৃত আব্দুল অহেদ,মাতা মৃত ফুলবরেন্নেসা। ৪ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।

বাড়ির ছোট ছেলে বলেই হয়তো সবার কাছে তিনি আদরের পাত্র ছিলেন। ছিলেন এক রোখা। ছোটবেলায় থেকে প্রচন্ড জেদী ছিলেন জাহের উদ্দিন।


১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা, তিনি তখন সবেমাত্র ১০ম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছেন,তখন তিনি ১৮ বছর বয়সের টগবগে এক তরুণ।
সেসময়টাতে যুদ্ধে অংশ নিতে তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠেন। বাড়ির ছোট ছেলেকে যুদ্ধে অংশ নিতে পরিবারের ছিলো শত বাঁধা বিপত্তি।
জাহের উদ্দিন পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রানপন চেষ্টা চালাতে থাকেন।

১৯৭১ সালের জুলাই মাসে (যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৩মাস পর) বাশারুক গ্রামের কয়েকজন তরুণ মিলে রাতের অাধাঁরে এম এ ওয়াহিদ সাবুরি,অলিউর রহমান,ইদিল মিয়া,ফুল মিয়া,আবু তাহের আর্মি,কাঁঠালিয়া গ্রামের ফজলু সহ তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউরার মুগরা মনিয়ন্দ এলাকা দিয়ে ইন্ডিয়ার হাপানিয়া ক্যাম্প/ সিদ্দিক এমপির ক্যাম্পে পৌঁছান।

৪দিন পর এম এ ওয়াহিদ সাবুরি গ্রামে এসে আবুল কালাম,দ্বীন ইসলাম পুলিশ,তারিফুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধে অংশগ্রহন করার জন্য ক্যাম্পে নিয়ে আসেন। এর পর তাঁরা সবাই বাঘমারা ট্রেনিং সেন্টার,ত্রিপুরাতে যান।

কথা ছিল একমাস ট্রেনিংয়ের পর বাংলাদেশে এসে অপারেশনে যোগ দিবেন। কিন্তু ২২ দিন পর বাংলাদেশের নবীনগর,কসবা এবং বাঞ্ছারাপুর উপজেলা থেকে মেসেজ যাওয়ায় ট্রেনিং শেষ করে দেশে চলে আসতে হয় জাহের উদ্দীনকে।

বাঘমারা ট্রেনিং সেন্টারে অফিসার এ এস লালিঙ্গা ওনাদের প্রশিক্ষণ দিতেন। অল্পসময়েই জাহের উদ্দীন ও তাঁর সাথীরা থ্রি নর থ্রি মার্ক ফোর,চাইনিজ স্ট্যানগান,এসএলআর মেশিনগান চালানো শিখেন। আরো অনেক গেরিলা কৌশলসহ ব্রীজ উড়ানোর কৌশল শিখেন।

ওনার অপারেশনের এলাকা ছিল নবীনগর। ভারত থেকে এসে বাংলাদেশে অপারেশনের সময় জাহের উদ্দীনের গ্রুপে ছিল ৪৩ জন। দেশের ভিতর থেকে আরো ৭ জন মুক্তিযুদ্ধা মিলে মোট ৫০ জনের গ্রুপ হয় তাঁদের।

এই ৫০ জনের গ্রুপ কমন্ডার ছিল ২জন,
গুড়িগ্রামের হাসান ভূইয়া এবং বাশারুক গ্রামের এম এ ওয়াহিদ সাবুরী।

“থ্রি নর থ্রি মার্ক ফোর” মেশিনগান হাতে নিয়ে জাহের উদ্দিন যুদ্ধে নামেন। ওনার গ্রুপের সদস্যরা অপারেশন শুরু করেন কালিগঞ্জ হতে লাউরফতেহপুর এলাকায়।
এরপর রমজান মাসে এগিয়ে চলে আসেন ইব্রাহিমপুর বাঁশবাজার এলাকায়। এই ৫০ জনের গ্রুপের সাথে যোগ দেয় আরো ২৩ জন বাংলাদেশী আর্মি ( তখন পাকিস্তানি আর্মি ছিল)।

আহাম্মদপুরের দাগুমিয়া মুসলিম লীগের নেতা ছিল সে পাকিস্তানিদের সহায়তা করতো । পরাজয় নিশ্চিত জেনে দাগুমিয়া ও নবীনগর থানার পাকিস্তানি দালাল ওসি নবীনগর থানা থেকে কুমিল্লায় পলায়ন করে ।

জাহের উদ্দিন ও তাঁর গ্রুপের সাথে অনেকবার সম্মুখ যুদ্ধ হয়। কনিকাড়ার সালাম (যার নামে নবীনগরে সড়কের নামকরন করা আছে) আলিয়াবাদের কাছে ব্যাংকার থেকে গুলি করার সময় শহীদ হন, বাউচাইলের কাদির হাতে গুলি লেগে আহত হন।

বাঁশবাজারের কাছে এক যুদ্ধে ২জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়, পরে একজন বন্দী হয়ে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেয়। তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে বন্দীকে অনান্য সৈন্যদের সাথে পতাকা উচিয়ে কথা বললে পাকিস্তানিরা ১দিনের সময় চায়। পরে ওরা বিশ্বাসঘাতকতা করে মুক্তিযুদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে নি কারণ ওদের ধারনা ছিল মুক্তিবাহিনীরা ওদের বাঁচিয়ে রাখবেনা ।

নবীনগরে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ১৬ জন পাকিস্তানি সেনা আত্নসমার্পন করে ইন্ডিয়ান আর্মির কাছে।
১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা ভারতের ত্রিপুরার ৬ মাইল ভিতরে প্রবেশ করেছিল। মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তানিদের সবপ্রকার রসদ ও যোগাযোগ বিছিন্ন করা হলে ওরা ভারতে আত্নসর্মপন করে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে আসার পর জাহের উদ্দীন ঢাকার পল্টনে অস্ত্র জমা দেন ওনার সাথে ছিলেন এডভোকেট আব্দুল লতিফ (সাবেক এমপি) বাশারুক গ্রামের লিল মিয়া,বাচ্চু মেস্ত্রী, বাচ্চু আর্মি, লবসা ফকিরের বাড়ির নুরুল ইসলাম,দানা মিয়া(ফজুল হক),সুবেদার সিদ্দিকুর রহমান।

বাশারুক গ্রামের মাত্র এলেশকার রাজাকার ছিল যে পাকিস্তানিদের সহায়তা করতো। কিন্তু সে গ্রামের বা এলাকার কোন ক্ষতি করে নাই ।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাশারুক গ্রামে পাকিস্তানিরা কোন ক্ষতি করেনি। বাশারুক গ্রামে আরেকজন ছিলেন রাজ্জাক ক্বারি যিনি শরনার্থীদের ভারতে পৌঁছে দিতে সহায়তা করতেন ।

বাশারুক গ্রামের দানা মিয়া,নুরুল ইসলাম সিলেটে যুদ্ধ শেষ করে ১৪দিন হেঁটে বাড়িতে এসেছিল ।

জাহের উদ্দীন মনে করেন মুক্তিযোদ্ধের অবদান সরূপ চাকরী ও অনান্য ক্ষেত্রে কোটা তাঁদের পাওয়া উচিত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনি কোটাকেও কোটাহীনদের জন্য তিনি বৈষম্য মনে করেন না।

তিনি আরো বলেন লাউর ফতেহপুরে ইউনিয়নে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ১০৯ জন আছে ভূয়া সহকারে। পুরা নবীনগর উপজেলায় ৫০০ অধিক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আছে বলে তিনি মনে করেন।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপট ও নৈরাজ্যের কারণে এখন তিনি লাউর ফতেহপুর মুক্তিযোদ্ধা অফিসেও বিশেষ কোন কাজ ছাড়া যান না।
তিনি আরো বলেন; পাকিস্তানিদের শোষণ,বৈষম্য, অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমরা ১৯৭১ সালে স্বাধীন হলেও এত বছর পরেও অবিচার,অত্যাচার,শোষণ রয়েই গেছে।
তিনি সরকারের কাছে প্রত্যাশা করেন সরকার যেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দ্রুত খুঁজে বের করে তাদের সব প্রকার সুযোগ সুবিধা বাতিল করা হয় ।

( বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহের উদ্দিনের সাথে কথোপকথন,সময় দুপুর ২:৩০,জানুয়ারি ১৯,২০১৭)

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 25653 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০