শিরোনাম

প্রচ্ছদ খোলা কলাম, শিরোনাম, স্লাইডার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘ঐতিহ্যবাহী’ সংঘাত- কেন, কিভাবে এবং কিভাবে!

ইমরান চৌধুরী | শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২০ | পড়া হয়েছে 683 বার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘ঐতিহ্যবাহী’ সংঘাত- কেন, কিভাবে এবং কিভাবে!

২০০৮ সন থেকে দেশের বিভিন্ন প্রসঙ্গে এতো লিখেছি যে, আমার প্রোফাইলে প্রায় প্রতিটি জেলার নাম লিখে সার্চ করলে হয়তো সংশ্লিষ্ট জেলা সংশ্লিষ্ট কোন না কোন লেখা মিলবে। এই লেখাগুলোতে ‘ওমুক জেলার মানুষ খারাপ’ টাইপের লেখা নেই। ভালো এবং খারাপির কোন নির্দিষ্ট জেলা ভিত্তিক প্যাটার্ন নেই। এগুলো করোনাভাইরাসের মতো বিস্তৃতি লাভ করে।

হালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটা কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে এই জেলার জাত উদ্ধার করছে কেউ কেউ। আমি কক্ষনো তেমনটা করতে পারিনা। আমার মনে হয়, যেকোন স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরই এইটুকু স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থায় মতামত প্রকাশ করা উচিত।


জীবদ্দশায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাথে আমার প্রথম পরিচিতি ঘটে মারামারির ঘটনা শুনে নয়, বরং টেস্ট পেপারে থাকা অন্নদা স্কুলের প্রশ্নের আমল করে আর খুবই সুস্বাদু এবং অতীব প্রিয় অ্যাপেটাইজার শিঁদল শুঁটকির ভুনা স্বাদ নেয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশে চ্যাপা বা শিঁদলের রাজধানী মনে হয় বৃহদাকার হাওর ও বিল অধ্যুষিত দুই প্রতিবেশী জেলা কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

যাহোক, করোনাতঙ্কের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দৃশ্যত তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন ভীষণ লড়াইকে স্রেফ একটি জেলার মানুষের স্বভাবগত দোষের বহিঃপ্রকাশ বলে চালিয়ে দেয়া দায়িত্বশীলতা নয়। কারণ এধরণের প্রবণতা তো আমাদের থামাতে হবে। আর সেজন্য সমস্যার মূলে প্রবেশ করতে হবে।

এখন নয়, যখন থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলায় গ্রামে গ্রামে লড়াইয়ের কথা জেনেছি, তখনই স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্নের উদয় হয়েছে যে, এর মূলে কোন ইতিহাস নিশ্চয়ই আছে। এমনকি জেনারেল ফজলুর রহমানের সাথেও এই বিষয়ে কথা বলেছি। স্যার ৩৩ ডিভিশনের জিওসি ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেহেতু অতীব স্পর্শকাতর এক ভৌগলিক অবস্থানে রয়েছে, সেহেতু এখানে ওই ডিভিশনের প্রশিক্ষণ কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি বেশি।

এজন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসব মারামারির প্রবণতা বরাবরই সেনাবাহিনীর জন্য আগ্রহের বিষয়বস্তু ছিলো।

যেকোন কারণেই হোক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটি আদর্শিক ফল্ট লাইনে অবস্থিত। আর এই ফল্ট লাইন তৈরি হয়েছে ধর্মীয় বিষয়ে বহুমত ও বিসংবাদ থেকে। এই জেলায় অন্যান্য জেলার তুলনায় বড় হুজুরের সংখ্য বেশি। বড় হুজুরদের উদ্ভব ঘটে সম্ভবত ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয় অত্যাচারী হিন্দু জমিদার আর গরীব মুসলিম প্রজাদের দরমেয়ান ঢাল হিসেবে। কালক্রমে এসব খানকাহ নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দলেও জড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বাংলাদেশে হুজুর সম্প্রদায়ের মূল ধারার রাজনীতিতে প্রবেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বড় যোগদান আছে। কৌতুহলের ব্যাপার হচ্ছে, এই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই প্রথম কাদিয়ানী সম্প্রদায়েরও উদ্ভব ঘটে।

এরকম বিভিন্ন মেরুকরণের কারণে ওই এলাকায় গ্রামে গ্রামে সড়কি, বল্লম, দা, কুঠার নিয়ে লড়াইয়ের প্রবণতা গড়ে ওঠে। এখন হয়তো আরো বহু বিষয় বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে পরিস্থিতিকে বেগতিক করে ফেলেছে। এর মধ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক বিবাদও একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোন এলাকার মানুষ পয়দায়েশ খারাপ হয় না। বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতা, এমনকি ভৌগলিক বাস্তবতা একটি এলাকার মানুষের জীবনাচরণ বা প্রবণতাকে প্রভাবিত করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাগুলোকেও কেবল লুডু খেলা বা ঝালমুড়ি খাওয়া নিয়ে বিবাদ বলে সরলীকরণ করা যাবেনা। পৃথিবীতে হাজার কিসিমের মানুষ আছে। তাদের আছে হাজার বৈশিষ্ট্য। এসবের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্যই সাধারণ- মৃত্যুভয়। এখানে সাংবাদিকরা যতোই লুডু আর ঝালমুড়িকে কাঠগড়ায় দাঁড়া করাক না কেন, পেছনে কোন সদূর প্রোথিত ইতিহাস আছে, যার জন্য তুচ্ছ ঘটনাতেই কিছু উপজেলার গ্রামে গ্রামে সহিংসতার বারুদে ধামাকা হচ্ছে। কোন গভীর কারণ ছাড়া মানুষ মৃত্যুভয়কে তুচ্ছজ্ঞান করেনা।

এই প্রবণতা নিরসন করতে হলে উপদ্রুত এলাকার লোকজনের মধ্যে একাদিক্রমে সামাজিক সচেতনতা, সহিংসতার পেছনের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সর্ট আউট করা এবং মানুষের মধ্যে এধরণের মারামারির পরিণাম বিষয়ে ভীতি সঞ্চারমূলক তৎপরতা জোরদার করতে হবে।

সামাজিক সচেতনতায় স্থানীয় শিক্ষিত ও সচেতন ছেলেমেয়েদের, সংঘাতের কারণ অনুসন্ধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট অ্যাপারেটাস এবং ভীতি সঞ্চারমূলক তৎপরতায় পুলিশ ও বিজিবিকে দীর্ঘমেয়াদে টাস্কিং করতে হবে। বৃটিশ ভারতে যেভাবে ঠগীদের দমন করা হয়েছিলো, নিউ ইয়র্কে যেভাবে মাফিয়াতন্ত্র গুড়িয়ে দেয়া গিয়েছিলো, পাকিস্তান যেভাবে উপজাতীয় এলাকায় সন্ত্রাসীদের উপর কেয়ামত হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলো; সেভাবেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মারামারিকে সংঘবদ্ধ অপরাধ বা অর্গানাইজড ক্রাইম হিসেবে গণ্য করে এর সমূলে বিনাশ করতে হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর মতো গুণী ও সুকুমার প্রবৃত্তিসম্পন্ন ভালো মানুষের জন্মদাতা। ‘মাইহার ঘরানার’ স্থপতি আলাউদ্দীন খাঁ উচ্চাঙ্গসংগীতের একমেবাদ্বিতীয়ম প্রাণপুরুষ।

এই বাংলার বেশিরভাগ ঘরে যখন অজ্ঞতা আর অশিক্ষার অমানিশি চলমান, তখন এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৈয়দ শামসুল হুদা বাংলার গভর্নর টমাস কারমাইকেলের নির্বাহী পরিষদের শিক্ষা বিষয়ক সদস্য বা শিক্ষামন্ত্রী। বাংলাদেশের বহু পুরানো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা গত শতকের দ্বিতীয় শতকে নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ গ্রামের এই কৃতি সন্তানের ঐকান্তিকতায় নির্মিত হয়েছে। রংপুরের কারমাইকেল কলেজও তেমন একটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় সৈয়দ শামসুল হুদার অবদান বিরাট বড়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কড়ে আঙ্গুলে গুনতে সক্ষম যে কয়জন মুসলিম স্কলার ছিলেন, সৈয়দ শামসুল হুদা ছিলেন তাঁদের একজন। তিনি ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সিনেটের সদস্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে তিনি সম্মানসূচক ‘টেগোর প্রফেসর’ ছিলেন।

কড়ে আঙ্গুলে গুনতে সক্ষম সেই সকল মুসলিম বুদ্ধিজীবীর আরেকজন ছিলেন নাসিরনগর উপজেলারই গুনিয়াউক গ্রামের সন্তান আবদুর রসুল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়ানী আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর আবদুর রসুল ছিলেন প্রথম বাঙ্গালী মুসলিম ব্যারিস্টার। তিনি ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেছিলেন মিডল টেম্পল থেকে।

এদেশের সব জায়গার ইতিহাস ঘাটলেই এমন ব্যক্তিবর্গের সন্ধান পাওয়া যাবেনা। এই কৃতি সন্তানগণের পূণ্য স্মৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার ওয়াস্তে হলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে কতিপয় উপমানব সৃষ্ট এমন নিম্নমানের বদনাম থেকে মুক্ত করা উচিত। আমার ক্ষুদ্র ও দূরবর্তী অবস্থানে প্রণীত বিবেচনায় আমি কিছু সমাধানসূত্র দিলাম। আরো ভালো ভালো এবং মোক্ষম সমাধানসূত্র আসতে পারে…।

 

লেখক-

ইমরান চৌধুরী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 4578 বার

নবীনগরের এপ্রিল ট্রাজেডি ১৯৭১

২৯ এপ্রিল ২০১৭ | 2612 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০