শিরোনাম

প্রচ্ছদ আলোকিত জন, নবীনগরের খবর, শিরোনাম, স্লাইডার

শহীদ আব্দুল লতিফ: মৃত্যুহীন এক প্রাণ

জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন। | রবিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | পড়া হয়েছে 1229 বার

শহীদ আব্দুল লতিফ: মৃত্যুহীন এক প্রাণ

সিনেমা হলের রুপালী পর্দায় আমরা যারা এ্যাকশান হিরো আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার ও সিলভেস্টার স্ট্যালোন’র কমান্ডো অভিযান দেখে রোমাঞ্চিত হয়। অথবা বাসার ড্রয়িং রুমে বসে টিভি সেটে আজকের প্রজন্মের যারা যুদ্ধ ছবি ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ ও ‘ব্লেক হক ডাউন’ দেখে আতংকে ভয়ে শিউরে ওঠেন। তাদের কেউ জানবে না কোন দিন যে, একাত্তরে সারা বাংলার বুক জুড়ে এরচেয়ে লোমহর্ষক বহু অপারেশন করেছিল আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। হালদা নদী অপারেশন তারই একটি। আজ শুনাব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক দূর্ধর্ষ ফাইটারের গল্প। কল্পিত নয় বাস্তব কাহিনী।

আব্দুল লতিফ। ১৯৭১ সালে চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। পদবী হাবিলদার।পৈত্রিক বাড়ী ব্রাহ্মনবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার মহেষপুর গ্রামে (বিটঘর ইউনিয়ন)। অবিবাহিত আব্দুল লতিফের বাবার নাম লিল মিয়া, মা গোলাপি বেগম। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর পোস্টিং ছিল কুমিল্লা সেনানিবাসে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সেখান থেকে পালিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। যুদ্ধ করেন ২নং সেক্টরের মন্দভাগ ও সালদা নদী সাব-সেক্টরে।


সালদা নদী। কসবা উপজেলার অন্তর্গত সীমান্ত এলাকা। মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ রনাঙ্গন। রেল যোগাযোগের কারনে সালদা নদী ও সালদা রেলষ্টেশন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি গুরত্বপূর্ন ও দূর্ধর্ষ ঘাঁটি। যুদ্ধ ছিল সেখানে একটি নিয়মিত ঘটনা।

২১/২২ অক্টোবর ১৯৭১। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বালুচ রেজিমেন্টের একটি বড় দল সালদা নদী পাড়ে সমবেত হন। তারা সেখানে বাংকার খনন করতে থাকে। এ কারণে অধিনায়ক মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশ দিলেন তা প্রতিহত করতে। নির্দেশ মোতাবেক মুক্তিযোদ্ধারা ৩টি দলে বিভক্ত হয়ে প্রস্তুত হলেন। একটি দলে ছিলেন আব্দুল লতিফ।

অন্ধকার রাত। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আব্দুল লতিফ ও তাঁর সহযোদ্ধারা নি:শব্দে এগিয়ে যেতে থাকলেন।তাঁদের লক্ষ্য সালদা নদীর অপর পাড়ের শত্রু ঘাঁটি। চরম বিপদজনক ও ঝুঁকিপূর্ন এক অপারেশন। ২৩শে অক্টোবর গভীর রাতে (ঘড়ির কাটা হিসাবে ২৪শে অক্টোবর) তিনদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সাড়াঁশি আক্রমণ করেন। তখন সেখানে এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আব্দুল লতিফ ছিলেন নদী অতিক্রমকারী সামনের দলে। আব্দুল লতিফ সহ কয়েকজন যোদ্ধা কমান্ডো কায়দায় যুদ্ধ করতে করতে পাকিস্তানি সেনাদের নাকের ডগার মধ্যে ঢুকে পড়েন। চোখে না দেখলে কেউ তা বিশ্বাস করতে পারবে না, এটা কিভাবে সম্ভব হলো! মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমণে পাকসেনারা তখন হতভম্ব, দিশেহারা। বীরত্বের সংগে যুদ্ধ করে আব্দুল লতিফ একের পর এক বাংকার ধ্বংস করছেন। বীরদর্পে সামনে আগুয়ান। শত্রু নিধনে তিনি রীতিমত উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। তখন হঠাৎ অন্য একটি বাংকার থেকে ছোড়া এক ঝাঁক গুলি এসে লাগে আব্দুল লতিফের শরীরে। ঝাঁজরা দেহ নিথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে। বীরের মতই শহীদ হন তিনি। বাংলার পবিত্র মাটিতে পড়ে থাকে দ্রোহী নির্ভীক যোদ্ধা আব্দুল লতিফের প্রানহীন দেহ। স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনার লড়াইয়ে মুক্তিযোদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে যোগ হয় আরেকটি নাম, শহীদের কাফেলায়। এ যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

বাংলাদেশ সরকার আব্দুল লতিফ এঁর অসীম সাহসিকতার পুরস্কার স্বরুপ বীর প্রতীক খেতাব দিয়ে তাঁর শহীদি আত্বার প্রতি সম্মান পরিদর্শন করে। তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৯২। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নবীনগরের সূর্যসন্তান শহীদ আব্দুল লতিফের নাম স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে। যাঁর জীবনের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি নিজস্ব পরিচয়। স্বাধীন বাংলাদেশ।

“……হেথা এই সালদা নদীর তীরে,
ঘুমিয়ে আছো শেষ শান্তির নীড়ে!

দাড়াও পথিক জানো কি তোমরা কেউ,
শত শহীদের একজনা হয়েছে সেও…..”!!

28685257_1800477386692311_1968800155007400288_nগ্রন্থনা : জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন।

তথ্য ঋণ:
>> বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্র।
>> বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস।
>> একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা- প্রথমা প্রকাশনী।
>> উইকিপিডিয়া।
>> বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নজরুলের স্ত্রী হাজেরা নজরুল।

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ড.আকবর আলী খান

১২ মে ২০১৬ | 6901 বার

আমরা তোমাদের ভুলবনা

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 6266 বার

তুষার আব্দুল্লাহ

২৬ এপ্রিল ২০১৬ | 2954 বার

‘শেষ ব্যক্তি শেষ বুলেট’

২৯ নভেম্বর ২০১৮ | 1822 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০