শিরোনাম

প্রচ্ছদ আলোকিত জন, শিরোনাম, স্লাইডার

শাহজাহান সিদ্দিকী (বীর বিক্রম)

জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন | বৃহস্পতিবার, ২৩ আগস্ট ২০১৮ | পড়া হয়েছে 1457 বার

শাহজাহান সিদ্দিকী (বীর বিক্রম)

১৯৭১।
১৫ই আগস্টের সকাল।
আকাশবাণী কলকাতা রেডিওতে বেজে উঠল একটি গান “ আমার পুতুল আজকে যাবে শশুরবাড়ী”। উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে শাহজাহান সিদ্দিকী। সারা পৃথিবী শুনল আরতি মুখোপাধ্যায়’র গান আর মুক্তিযোদ্ধের নৌ-কমান্ডোরা পেয়ে গেলেন অপারেশনের গ্রীন সিগন্যাল। সেদিনের সূর্য আস্তে আস্তে পশ্চিম আকাশে বিদায় নিল। দ্রুতই প্রস্তুত হন নৌ-কমান্ডোরা; প্রত্যেকেই সঙ্গে নেন একটি স্টেনগান, এক জোড়া ফিঞ্চ, একটি ছুরি আর বুকে বাঁধা ৫ কেজি ওজনের লিমপেট মাইন। এই রাতই শেষ রাত, আগামীকালের সকাল হয়ত কারো জীবনে আসবেনা। বাছাইকৃত নৌ-মুক্তিযোদ্ধাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল ‘এটি একটি সুইসাইডাল অপারেশন বা আত্বঘাতী যুদ্ধ হবে।
বলছি “অপারেশন জ্যাকপট” এর কথা। শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেই নয় পৃথিবীর ইতিহাসে দূর্ধর্ষ এক নৌ-কমান্ডো অভিযান। যা একযোগে চালানো হয় চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরসহ দাউদকান্দি, চাঁদপুর ও নারায়নগঞ্জে। দাউদকান্দি ফেরীঘাটের দুঃসাহসিক অপারেশনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন নবীনগরের বীর সন্তান; মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র বেসামরিক নৌ-কমান্ডো লিডার শাহজাহান সিদ্দিকী।

জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৭শে জুলাই।
জন্মস্থান ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার সাতমোড়া গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন দুরন্ত; সাঁতার গোল্লাছুট সব খেলাতেই পটু। ১৯৭১ সালে ২৪ বছরের যুবক শাহজাহান সিদ্দিকী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র। ২৫শে মার্চের গনহত্যার পর বুঝলেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে; সুতরাং মু্ক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে হবে। এপ্রিল মাসের শুরুতে এক রাতের আঁধারে গ্রামের বাড়ী থেকে বের হয়ে পরলেন, আগরতলার উদ্দেশ্য। সাথে নিলেন মায়ের দেওয়া ২ মন চাউল বিক্রীর টাকা; আর আগরতলায় বিক্রী করলেন শেষ সম্বল বাবার দেওয়া হাত ঘড়িটি, ২৯ টাকায়।
মে মাস থেকে শুরু হল নৌ-কমান্ডো ট্রেনিং।


#অপারেশন_জ্যাকপট ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের কাছে অত্যন্ত জরুরী ও টপ সিক্রেট অপারেশন। এমনই গোপনীয় যে, বাঙালিদের মধ্যে শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহাম্মদ ও জেনারেল ওসমানী জানতেন।

টার্গেট দাউদকান্দি ফেরীঘাট! আগস্ট মাসের শুরুতে শাহজাহান সিদ্দিকী ও তাঁর সহযোদ্ধারা ভারত থেকে আশ্রয় নেন দাউদকান্দির বন্দরামপুর গ্রামে। নির্ধারিত দিনে রেডিও মাধ্যমে সিগন্যালও পেয়ে যান। কিন্ত ১৫ই আগস্ট রাতে প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি ও গাইডের অসুস্থতার কারণে অপারেশন করতে ব্যর্থ হয়। যদিও এরই মধ্যে চট্টগ্রাম, মংলা ও চাঁদপুর বন্দরে জ্যাকপট অপারেশন সম্পন্ন হয়ে গেছে। ফলে দেশের বাদবাকী নদী বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে জারী করা হয় রেড এলার্ট। তাই পরেরদিন দাউদকান্দি ফেরীঘাট আক্রমণ ছিল খুবই বিপদজনক, অনেকটা সুইসাইড এট্যাক। নিশ্চিত মৃত্যু।

ভয় কি মরণে, রাখিতে সন্তানে !
মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে !!

১৬ই আগষ্ট রাতের বেলা ধান ক্ষেতের মধ্য দিয়ে চলছে নৌ-কমান্ডোদের ছইয়া নৌকা, দাউদকান্দি ফেরী ঘাটের উদ্দেশ্যে। চারদিক নিকষ অন্ধকার। শুধু ধান ক্ষেতের পাতা নড়ার শব্দ, মাঝে মাঝে ঝি ঝি পোকার ডাক। দুরত্ব ৮-৯ কি:মি:। চলছে শাহজাহান সিদ্দিকী ও কয়েকজন নৌ-কমান্ডো। অনাগত এক সূর্যের খোঁজে; এক নতুন ভোরের প্রত্যাশায়।

ফেরীঘাটের ২ কি:মি: কাছাকাছি এসে তাঁরা উঠলেন খোলা নৌকায়। সুবিধাজনক জায়গায় এসে তিনজন তিনজন করে নেমে পড়লেন পানিতে। প্রচন্ড স্রোত ও প্রচুর কচুরিপানা ছিল নদীর পানিতে। উল্টো হয়ে কোনরকমে নাকটা জাগিয়ে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে ভেসে যাওয়ার মতোই যাচ্ছিলেন তাঁরা। যখনই পাহারাদার শত্রুরা বড় টর্চ ঘোরাত, তখনই তাঁরা নিঃশব্দে ডুব দিত। অন্ধকারে শত্রুরা বুঝতেই পারেনি কুচুরিপানার নিচে মানুষ আছে। ২০ গজ দুরত্বে এসে ডুব সাঁতার দিয়ে ফেরীর বডিতে চলে আসেন। কয়েক ফিট উপরে পাকবাহিনী আর নিচে শাহজাহান সিদ্দিকী। শুরু করলেন মাইন ফিটিং।২টা ফেরী ও পল্টুনে লাগালেন লিমপেট মাইনগুলো। তারপর সাঁতার কেটে রওনা হলেন স্রোতের উজানে। সবাই যখন নৌকায় পৌঁছলেন তখন রাত আনুমানিক আড়াইটা। শুরু হল বিস্ফোরণ। শেষ রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে ফেরীঘাট ও আশেপাশের এলাকা প্রকম্পিত। নদীর জল ও দুই পাড় কাঁপিয়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হল ৯টি মাইন। পুরো দাউদকান্দি কেঁপে উঠে। ধ্বংস হয়ে ডুবে যায় ফেরী, জাহাজ ও পল্টুন।
অবিশ্বাস্য !
ভয়ঙ্কর !!
বিস্ময়কর !!!

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে “অপারেশন জ্যাকপট” অপরিসীম গুরত্ব বহন করে। এ অপারেশনের বিশালতা ও ক্ষয়ক্ষতি এত ব্যাপক ছিল যে তা পাকিস্তান সরকারের ভীত কাঁপিয়ে দেয়। পুরো বিশ্ব হতভম্ব হয়ে যায়। সারা বিশ্ব বুঝতে পারে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সংগে পাল্লা দিয়ে সমানে লড়ছে। এটাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নবীনগরের সূর্যসন্তান শাহজাহান সিদ্দিকী’র স্মৃতি ও সাহসিকতার পরিচয় সর্বদায় গর্বের কালিতে লিখা থাকবে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্যে বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে।

জনাব শাহজাহান সিদ্দিকী ২০০৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসাবে অবসর নেন। বর্তমানে ঢাকার উত্তরায় বসবাস করেন।

আজ সেই স্মরণীয় ১৬ই আগস্ট।
দু:সাহসিক দাউদকান্দি অভিযানের এই দিনে তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

1020✒️সংকলক ও লেখক: জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন।

তথ্যঋণ:
> গান যখন কমান্ডো হামলার সিগন্যাল – লেখক শাহজাহান সিদ্দিকী (বীর বিক্রম)।
> খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা- প্রথমা প্রকাশনী।
> তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না- দৈনিক প্রথম আলো।
> উইকিপিডিয়া।
> সাক্ষাত্কার – শাহজাহান সিদ্দিকী (বীর বিক্রম), ntv online.

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ড.আকবর আলী খান

১২ মে ২০১৬ | 6901 বার

আমরা তোমাদের ভুলবনা

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 6266 বার

তুষার আব্দুল্লাহ

২৬ এপ্রিল ২০১৬ | 2954 বার

‘শেষ ব্যক্তি শেষ বুলেট’

২৯ নভেম্বর ২০১৮ | 1822 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০