শিরোনাম

প্রচ্ছদ নবীনগরের খবর, শিরোনাম, স্লাইডার

সারেন্ডার এ্যাট নবীনগর

জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন | শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮ | পড়া হয়েছে 904 বার

সারেন্ডার এ্যাট নবীনগর

আর নয় লুকিয়ে এ্যামবুশ কিংবা গেরিলাযুদ্ধ। এবার হবে নেক টু নেক ফাইট। প্রস্তুত নবীনগরের দূর্বাদল মুক্তিবাহিনী। নবীনগরের পবিত্র মাটি থেকে এবার শকুন বিতারণের পালা। মূলত: ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহে আখাউরা ও কসবা পতনের পর নবীনগরের মুক্তিযোদ্ধারা বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত জন্মস্থান নবীনগরে আসতে থাকে। উদ্দেশ্য নবীনগরকে হানাদার মুক্ত করা।

১৯৭১ সালে পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়টুকু জোরেই নবীনগরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মূল ঘাঁটি ছিল সদরের পাইলট হাই স্কুল ও থানা ভবনে। এছাড়াও বেশ কিছু রাজাকার নবীনগর জমিদার বাড়ীর দোতলায় অবস্থান করত।


৬ই ও ৭ই ডিসেম্বর > দক্ষিন মহল্লা হয়ে আনুমানিক দেড়শ মুক্তিযোদ্ধা কড়ুইবাড়ী গ্রামের মুনসুর আলীর নির্জন বাড়ীতে আস্তানা গাড়েন।

৮ই ডিসেম্বর > কড়ুইবাড়ী থেকে অগ্রসর হয়ে সম্মিলিত মুক্তিযোদ্ধারা ইব্রাহিমপুরের সুদন মিয়ার বাড়ীতে অবস্থান নেন। প্রস্তুত হতে লাগলেন শেষ যুদ্ধের, রাতেই চূড়ান্ত করেন আক্রমণের নীল নকশা। পরিকল্পনা হল: উত্তর ও দক্ষিন দিক থেকে ২টি দলে বিভক্ত হয়ে নবীনগরে সদরে অবস্থিত পাক বাহিনীকে তীব্র আক্রমন করার। কুয়াশাছন্ন শীতের রাত। তীব্র শীত। অন্ধকার ও কুয়াশার বাঁধা উপেক্ষা করে, মধ্যরাতে ৭০ থেকে ৭৫ জন মুক্তিযোদ্ধা নি:শব্দে শ্রীরামপুরের উপর দিয়ে এসে ‘আলমনগর-নরসিংহপুর-মনতলায়’ ত্রিভূজ আকারে বেস্টনী গড়ে তোলেন। অন্যদিকে মাঝিকাড়া গ্রামে অবস্থান নেন আনুমানিক আরো ৭৫ জন। পুরো অবরোধে অংশ নেয় আনুমানিক ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা। টানটান উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন তাঁরা।

৯ই ডিসেম্বর > এলাকা জুড়ে থমথমে অবস্থা। অবশেষে ভোরে মু্ক্তিযোদ্ধারা উত্তর ও দক্ষিন দিক থেকে সম্মিলিত আক্রমন চালায়। পাকিস্তানী সেনারাও বসে থাকেনি, পাল্টা আক্রমন চালায়। মর্টার নিক্ষেপে মাঝিকাড়া গ্রামের সমস্ত কাঠের দোকানগুলো জ্বালিয়ে দেয়।

১০ই ডিসেম্বর > সকাল ৬টায় নবীনগর উত্তরপাড়া দিয়ে ১৫জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল কমান্ডো কায়দায় ক্রলিং করে সদরের অভিমুখে রওনা হয়। তাঁদের সাথে জমিদার বাড়ীতে অবস্থানরত রাজাকারদের সংঘর্ষ হয়। এতে কালিপুরের হাবিলদার কালা মিয়া ও কনিকাড়ার মোবারক হোসেন গুরুতরভাবে আহত হন। (এই সংঘর্ষে আহত হয়ে কালা মিয়া পরবর্তীতে পঙ্গুত্ব জীবনযাপন করেন)। রাতে নবীনগর সদর থেকে একজন পান্জাবী সৈন্য স্ত্রীলোকের ছদ্মবেশে ভৈরব পালিয়ে যাওয়ার পথে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে।

১১ই ডিসেম্বর > থানার বাংকারে থাকা পাক সৈন্যরা হাইস্কুলের ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। রাজাকাররা পালিয়ে যায়, পালানোর সময় ১৩ জন রাজাকার আলমনগর ও নবীপুরে সাধারন মানুষের গনপিটুনিতে নিহত হয়। মূলত পাকবাহিনীর ‘হাইস্কুল ক্যাম্প’ ব্যতীত সেদিন সমস্ত নবীনগর মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। সকাল ১১টায় মুক্তিযোদ্ধারা বর্তমান তহশিল অফিসের সামনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। দুপুরে থানা ভবনের ছাদ থেকে আটককৃত পান্জাবী সৈন্যর মাধ্যমে উচ্চ:স্বরে হাইস্কুলের ছাদে আবস্থানরত পাকসৈন্যদের সারেন্ডারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবে রাজী হয় পাক বাহিনী, সিদ্ধান্ত হয় পরের দিন সকাল ৭টায় আত্বসমর্পণ অনুষ্ঠিত হবে। ফলে ১১ তারিথ সমস্ত দিন দু’পক্ষের গুলাগুলি বন্ধ থাকে।

১২ই ডিসেম্বর > সারেন্ডারের ব্যাপারে পাকিস্তানী সৈন্যদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। ফলশ্রুতিতে মুক্তিবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ আবার শুরু হয়।

১৩ই ডিসেম্বর > দূর্ভাগ্যজনকভাবে হানাদারদের গুলিতে কনিকাড়া গ্রামের নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম সরকার শহীদ হন। (পরবর্তীতে নবীনগর পাইলট হাইস্কুল প্রাঙ্গনে তাঁকে সমাহিত করা হয়। নবীনগর বাজারের প্রধানতম রোডটি তাঁর নামে ‘সালাম রোড’ নামকরন করা হয়)। ব্রাহ্মনবাড়ীয়া তখন হানাদার মুক্ত, নবীনগর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আহবানে হরন থেকে দূরপাল্লার ভারী আর্টিলারী শেলিং হতে থাকে। বেশুমার কামানের গোলা এসে পড়তে লাগল নবীনগরে সদরে। শব্দের তীব্রতায় পায়ের নিচে মাটি কেঁপে ওঠে। নিক্ষিপ্ত কামানের গোলার আঘাতে জমিদারবাড়ীর দেয়াল, প্রকৌশল অফিস ও নবীনগর বাজারের অনেক দোকানপাট ভস্মিভূত হয়। ভারতীয় আর্মির একটি হেলিকপ্টার নবীনগরের আকাশে চক্কর দিতে থাকে।

১৪ই ডিসেম্বর > ঐতিহাসিক মূহুর্তটি সমাগত ! নবীনগরের সদরের দক্ষিন দিক দিয়ে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সৈন্য সদরে প্রবেশ করে। দুপুরে সর্বমোট ১৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য বিনাশর্তে মিত্রবাহিনীর নিকট আত্বসমর্পণ করে। যে দাম্ভিক পাকিস্তানী সৈন্যরা হিংস্র হায়েনার মত আচরন করত তারাই সেদিন নেড়ী কুত্তার মত লেজ গুটিয়ে বশ্যতা স্বীকার করে। এই সারেন্ডারের মধ্য দিয়ে মুক্তিলাভ করে নবীনগরবাসী ! শত্রুমুক্ত হয় নবীনগর !!

 

28685257_1800477386692311_1968800155007400288_nগ্রন্থনা : জোবায়েদ আহাম্মদ মোমেন।

 

ঋণী:

>> মূল লিখা- আবু কামাল খন্দকার- বিবৃতি, নবীনগর প্রেস ক্লাব ।

>> জয়দুল হোসেন- ব্রাহ্মনবাড়ীয়া।

>> শতবর্ষী পূর্তি স্মরণিকা- নবীনগর পাইলট হাই স্কুল।

 

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নবীনগরে ভুয়া পুলিশ আটক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | 25751 বার

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১